Copyrights @ Journal 2014 - Designed By Templateism - SEO Plugin by MyBloggerLab

আমি বিভ্রান্ত হই ঃ কবিতা

লেখকঃ- মোঃ মোখলেছুর রহমান

আত্নীক যে প্রতীক গুলোকে বাঁধিয়েছে
এনের স্বর্ণীল ফ্রেমে সাজিয়ে,
ক্ষণে ক্ষণে, গভীর আবেগ দিয়ে।
ঝড়ের কবলেপড়া অসহায় সন্ধ্যাতেও
ঝড়ে ওরা পড়ে না রিদয়ের মেঝেতে।
শাপলা ফুলের আগাছায় ভরা বিল পাড়ে
জলপ্রবাহে ঘেরা আধো সবুজ আধো সোনালী
উচ্ছৃঙ্খল ধানবাগান আর
চাঁধিফাটা রোদের বুকে উড়ন্ত গাংচিল
এঁকে দেয় আমার বুকে, সবুজাভ দিগন্তের মাথায়
নীলসাদা বিহঙ্গের বিচরণ ক্ষেত্রের
আমন্ত্রণ হাতছানির সচ্ল কাঠামো।
প্রকৃতির নীরব উপহাস সৃষ্টি করে-
প্রতিবন্ধকতা, বিব্রত বিবেক গতি হারায়।
আমি বিভ্রান্ত হই...

রফিক আজাদ

জন্ম: টাইঙ্গাইলের গুনি গ্রামে, ১লা ফাল্গুন ১৩৫০
পিতা: ছলিমইউ, খান
মাতা: রাবেয়া খান
পড়াশোনা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলা ভাষা ও সাহিত্য)









কবি রফিক আজাদের উল্লেখযোগ্য একটি কবিতা

 ভাত দে হারামজাদা


 ভীষণ ক্ষুধার্ত আছি: উদরে, শারীরবৃত্ত ব্যেপে
অনুভূত হতে থাকে-প্রতিপলে-সর্বগ্রাসী ক্ষুধা।
অনাবৃষ্টি-যেমন চৈত্রের শস্যক্ষেত্রে-জ্বেলে দ্যায়
প্রভূত দাহন-তেমনি ক্ষুধার জ্বালা, জ্বলে দেহ।

দু’বেলা দু’মুঠো পেলে মোটে নেই অন্য কোনো দাবি,
অনেকে অনেক কিছু চেয়ে নিচ্ছে, সকলেই চায়:
বাড়ি, গাড়ি টাকাকড়ি-কারু বা খ্যাতির লোভ আছে:
আমার সামান্য দাবি: পুড়ে যাচ্ছে পেটের প্রান্তর-
ভাত চাই-এই চাওয়া সরাসরি-ঠান্ডা বা গরম,
সরু বা দারুণ মোটা রেশনের লাল চালে হলে
কোনো ক্ষতি নেই-মাটির শানকিভর্তি ভাত চাই;
দু’বেলা দু’মুঠো পেলে ছেড়ে দেবো অন্য সব দাবি।

অযৌক্তক লোভ নেই, এমনকি, নেই যৌনক্ষুধা-
চাইনি তো: নাভিনিম্নে-পরা শাড়ি, শাড়ির মালিক;
যে চায় সে নিয়ে যাক-যাকে ইচ্ছে তাকে দিয়ে দাও-
জেনে রাখো: আমার ও-সবে কোনো প্রয়োজন নেই।
যদি না মেটাতে পারো আমার সামান্য এই দাবি,
তোমার সমস্ত রাজ্যে দক্ষযজ্ঞ কান্ড ঘটে যাবে;
ক্ষুধার্তের কাছে নেই ইষ্টানিষ্ট, আইন-কানুন-
সম্মুখে যা-কিছু পাবো খেয়ে যাবো অবলীলাক্রমে;
থাকবে না কিছু বাকি-চলে যাবে হা-ভাতের গ্রাসে।

যদি বা দৈবাৎ সম্মুখে তোমাকে, ধরো, পেয়ে যাই-
রাক্ষুসে ক্ষুধার কাছে উপাদেয় উপচার হবে।
সর্বপরিবেশগ্রাসী হলে সামান্য ভাতের ক্ষুধা
ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসে নিমন্ত্রণ করে।
দৃশ্য থেকে দ্রষ্টা অব্দি ধারাবাহিকতা খেযে ফেলে
অবশেষে যথাক্রমে খাবো:  গাছপালা, নদী-নালা,
গ্রাম-গঞ্জ, ফুটপাত, নর্দমার জলের প্রপাত,
চলাচলকারী পথচারী, নিতম্ব-প্রধান নারী,
উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ি-
আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ।

ভাত দে হারামজাদা, তা-না-হলে মানচিত্র ভাবো।।

শব্দ ফুল নীলিমা (লিটল ম্যাগ / ফয়জুল হাকিম)

নাম: শব্দ ফুল নীলিমা
প্রকাশের ধরণ: ত্রৈমাসিক কবিতাপত্র
সম্পাদক: ফয়জুল হাকিম
সংখ্যা:  
প্রকাশ কাল: আগস্ট-অক্টোবর ২০০৯
প্রকাশনা: শ্রাবণ, আজিজ সুপার মার্কেট
মুল্য:  ২০ টাকা
যোগাযোগ: শ্রাবণ, আজিজ সুপার মার্কেট, ঢাকা-১০০০। ফোন- ৮৬৫১১৬০
ওয়েব:

প্রতিবাদ (লিটল ম্যাগ / মান্নান মণি)

নাম: প্রতিবাদ
প্রকাশের ধরণ: অনিয়মিত সাহিত্য পত্রিকা
সম্পাদক: মান্নান মণি
সংখ্যা:  ২য়
প্রকাশ কাল: ফেব্রুয়ারি-মার্চ ২০০৯
প্রকাশনা: বাঙলাদেশ লেখক শিবির, কুষ্টিয়া
মুল্য:  ২০ টাকা
যোগাযোগ: বাঙলাদেশ লেখক শিবির কুমারখালী শাখা, কুষ্টিয়া
ওয়েব:


 

পারি (লিটল ম্যাগ / লাইলা খালেদ)

নাম: পারি
প্রকাশের ধরণ: নারী প্রগতির ত্রৈমাসিক
সম্পাদক: লাইলা খালেদ
সংখ্যা:  তৃতীয় বর্ষ- প্রথম সংখ্যা
প্রকাশ কাল: ডিসেম্বর ২০১৪- ফেব্রুয়ারি ২০১৫
প্রকাশনা: একটি ক্রিটিক প্রকাশনা (ঢাকা)
মুল্য:  ৫০ টাকা
যোগাযোগ: ৬৮/ক খিলগাও চৌধুরীপাড়া (হাজীপাড়া), খিলগাও, ঢাকা-১২১৯
ওয়েব:  www.paaribd.com





এক বাবার কথা (শরীফ হাসান / ছোট গল্প)

সম্রাজ্যবাদ ঔপনিবেশিক এর নায়াকৌশল হচ্ছে বাজার অর্থনীতি। আর এর অকল্যাণে তোমরা হয়তো আজ আমার বাবার নামটি পর্যন্ত জানবে না। আর যারা আমার বাবার নাম জানো তারাও মিডিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বের দশজন বর্বর লোকের তালিকায় আমার বাবার নামটা দেখতে পাবে। আজ দেশটির অস্থিত্ব বিশ্ব মানচিত্রে নেই সেটিই আমার বাবার দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন। আর আমার বাবার নাম স্ট্যালিন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমার বাবা সোভিয়েত ইউনিয়ন নামক রাষ্ট্রটির প্রধান ছিলেন। তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছো একজন রাষ্ট্র প্রধানের সন্তান হিসেবে আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলাম। যেমন তোমাদের দেশগুলোতে হয়ে থাকে।

এ সময় কাজের সন্ধানে বের হতে হলো আমার ভাইকে। অবশেষে তার একটা চাকরি হলো সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিক হিসেবে। এক্ষেত্রে আমার বাবার নাম কোনো কাজেই আসলো না। তাতোদিনে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করেছে হিটলারের জার্মান বাহিনী। আমার ভাইকে পাঠানো হলো জার্মান-বাহিনীকে মোকাবেলা করার জন্য যে ব্যাটেলিয়ান গেলো সীমান্তের দিকে সে ব্যাটেলিয়ানে। তখন জার্মানী থেকে যুদ্ধবিমান এসে আক্রমণ করে দেখে মনে হয় যেনো কালো মেঘ ধেয়ে আসছে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে। বিমান আক্রমণ শেষ হতে না হতেই, কামান আর ট্যাঙ্কের গর্জন। সোভিয়েত বাহিনী কোনো ভাবেই পতিরোধ করতে পারছিলো না জার্মান বাহিনীকে। তবুও তারা মরণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলো। এ যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সৈন্য মারা গিয়েছিলো সোভিয়েত বাহিনীর এ কথা তোমরা নিশ্চয়ই জানো।
যুদ্ধের মধ্যে একদিন জার্মান বাহিনীর বিমান আর পদাতিক আক্রমণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো আমার ভাইয়ের ব্যাটেলিয়ান। আমার ভাই বন্দী হলো জার্মান বাহিনীর হাতে। বন্দী অবস্থায় জার্মান বাহিনী জেনে গেলো আমার ভাইয়ের পিতৃ পরিচয়। মুহূর্তেই এ খবর চলে গেলো হিটলারের কাছে। হিটলার আমার বাবার কাছে চিঠি লিখলো-তাতে মূল বক্তব্য ছিলো সোভিয়েত বাহিনীর হাতে বন্দী এক জার্মান জেনারেলকে মুক্তি দিলে জার্মান বাহিনী আমার ভাইকে মুক্তি দিবে। আমার বাবা এ চিঠির উত্তরে লিখলেন-একজন জেনারেলের সাথে একজন সাধারণ সৈনিকের কখনো যুদ্ধ বিনিময় হয় না।
ঘটনা এখানে শেষ না। জার্মানিতে আমার ভাইকে কোর্ট মার্শালের সম্মুখীন হতে হলো। সেখানে তাকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হলো। আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে নানা ভাবে বাবাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হলো। যেনো আমার ভাই মুক্ত হতে পারে। কিন্তু আমাদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হলো। বাবা তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। জার্মানিতে আমার ভাইয়ের মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকরী হলো। বাবা সবই নিরবে দেখলেন।

সত্যি বিশ্বের দশজন বর্বর লোকের একজন আমার বাবা বলে তোমরা সবাই এখনো বিশ্বাস করো।

সেই সময়ের ঈদ (ফরহাদ খান / বিশেষ রচনা)

পুলক শব্দটাকে একসময় বেশ চল ছিল। রবীন্দ্রনাথের গানে, কবিতায় নানাভাবে পুলক শব্দের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। এক কাব্যবিশারদ রবীন্দ্রনাথের ‘কড়ি ও কোমল’- এর পুলক সম্পর্কিত একটি চরণ নিয়ে প্রবল ব্যঙ্গ করেছিলেন। কবিতার এই চরণ শব্দটিও এখন প্রায় অচল। মানুষের চরণেরও একই হাল। সব শব্দের একঘেয়েমি মানুষ বেশি দিন সইতে নারাজ।
যা-ই হোক, ‘কড়ি ও কোমল’ –এর পুলক নাচিছে গাছে গাছে। পুলককে গাছে গাছে নাচতে দিতে কাব্যবিশারদের ঘোরতর আপত্তি ছিল। পুলক পাখি নয়, বাঁদরও নয়। পুলকের অর্থ রোমাঞ্চ, আনন্দের অনুভব বা শিহরণ। এখন অবশ্য আনন্দ ও রোমাঞ্চ দুটো অর্থেই পুলক চলে। রোমাঞ্চ বা আনন্দকে তরুলতার শাখাপত্রে নাচতে দিতে কাব্যবিশারদ আপত্তি তুললেও আর কেউ তোলেননি। তোলার কথাও নয়। দৃশ্যটি অদৃষ্টপূর্ব নয় মোটেও। গাছ ছাড়াও পুলক অহরহ নানা কারণে নানা জায়গায় নাচে। ‘মধ্যে মধ্যে ভাগ্যবানে দেখিবারে পায়’।
পুলক শব্দের কথা এ জন্যই তোলা যে, ঈদ এলে গায়ে পুলক না লাগুক, পুল যে সর্বত্র তার নাচন শুরু করে দেয়, তা বেশ টের পাওয়া যায়। পুলক নাচতে থাকে রাস্তাঘাটে, ট্রেন-স্টিমারে, হাট-বাজারে, স্টোর-সুপারস্টোরে, ফুটপাতে, লক্ষাধিক টাকা দামের শাড়িতে, লেহেঙ্গায়।
আজ থেকে ষাট-সত্তর বছর আগে ঈদের পুলক গায়ে গায়ে বেশি নয়, গাছে গাছেই নাচতে বেশি। সাত-আট বছরের একশিশুর গায়ে জরিদার কটিপাঞ্জাবিই শহরের সিনেমা হলে হিন্দি সিনেমার কল্যাণে তখন দেখতে পাওয়া যেত, বাস্তবে নয়। তখন কী ছিল সাধারণ শিশুর? পপলিনের শার্ট, তাও আবার বৈচিত্রহীন রঙের-সাদা, নীল এবং ক্রিম। বিত্তবান বালকেরা পরত ইজিপশিয়ান কটনের শার্ট, এ কাপড়ের আরেক নাম ছিল মার্সিরাইজড কটন, যা নানা ঢঙে উচ্চারিত হতো। যাঁরা শহরে বাস করতেন অথবা যাঁরা উপন্যাস পড়তেন তারা সাটিনের জামা, সাটিনের পাজামা ইত্যাদির সঙ্গে নামে পরিচিত ছিলেন। বয়স বেশ খানিকটা বাড়লে ঈদে পাওয়া যেত পাঞ্জাবিই, সাদা আদ্দির। সুতি পাঞ্জাবির তখন একটাই রং। বয়স্করাও আদ্দির পাঞ্জাবি পরতেন। তবে বিত্তবানেরা ব্যবহার করতেন টুইলের কাপড়। বাচ্চা মেয়েদের জন্য কাপড় ছিল একটাই। ছিট কাপড়। তবে তা রংবেরঙের। কখনো কখনো সাটিন অথবা ভেলভেট।
ঈদে চাই নতুন জামা, নতুন জুতো-এ স্লোগান একালের বিজ্ঞাপনের। তখনকার শিশুরা এর খবর রাখত বলে মনে পড়ে না। তবে ঈদের দিনে জামাকাপড় ধোপদুরস্ত হওয়া চাই-এটা তারা জানত। কাপড় কাচার বিখ্যাত সাবানতখন সানলাইট,সোলার বল সাবান আসে আরও পরে। কাপড় নিজের হাতে অথবা মায়ের হাতে কাচা-যা-ই হোক না কেন, কাপড় দুরস্ত করা হতো নিজের হাতেই। তখন অদ্ভুত এক ইস্তিরি পাওয়া যেত-কাঠকয়লা পোরা বক্স ইস্তিরি বাড়িতে বাড়িতে নয়, পাড়ায় অথবা গ্রামের শৌখিন দু-একজনের বাড়িতে এটা থাকত বিকল্প ছিল পিতলের লোটা লোটার মধ্যে গনগনে কাঠকয়লা পুরে চলত জামাকাপড় দুরস্ত অর্থাৎ  ইস্তিরি করার কাজ। কিছুই পাওয়া না গেলে ব্যবস্থা ছিল কাপড় ভাজ করে বালিশের নিচে রেখে এক রাত ঘুমানো।
নতুন জুতো –স্যান্ডেল ছিল অকল্পনীয় এক ব্যাপার। গ্রামে যারা ছিল স্কুলবালক, সারা দিন তাদের কাটত খালি পায়ে, তারপর সন্ধ্যা হলে পা ধুয়ে খড়ম। স্যান্ডেলের বাহার ও বাহুল্য কোনোটাই তখন তেমন ছিল না। স্যান্ডেল সমস্যা বড়দেরও ছিল। কাবলি স্যান্ডেল অথবা পায়ের সামনে দুই দিকে বড় বড় ফুটোওয়ালা রাবারের চটি ছিল সাধারণ পদবাহন। বিত্তবানদের অবশ্য কটকি এবং কোলাপুরি চটির সঙ্গে অপরিচয় ছিল না। আর পাওয়া যেত জুতোর মতো পায়ের পাতার মাঝখান পর্যন্ত ঢাকা ব্রাউন রঙের ভারী স্যান্ডেল, বাটার তৈরি। অনেক পরে, বাটার স্পঞ্জের স্যান্ডেল পাদুকাজগতে বিপ্লব এনে দেয়।
স্কুলবালকদের জন্য ছিল নটিবয় স্যু। পিঠাপিঠি তিন ভাই হলে বড় ভাইয়ের জন্য কেনা এক জোড়া নটিবয় দিয়ে-পরের বছর মেজো ভাই, তার পরের বছর ছোট ভাই পর্যন্ত চলে যেত। এক-আধটু বড় হলে আঙুলের সামনে তুলো গুজে দিলেই কাজ চলত। ঈদে নতুন জুতো পাওয়া ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। যাদের ভাগ্যে জুটত তারা আনন্দে জুতো শুকত এবং অন্যদের শোকাত। শুধু অকারণ পুলকে নতুন জুতো মাথার কাছে রেখে গুমিয়েছে-এমন বালকের কথা গল্প নয়, সত্যি।
গুক্লপক্ষে চাদের আলো আর কৃষ্ণপক্ষে জোনাকির আলো-এই আলো নিয়ে ছিল গ্রাম-মফস্বলের প্রাকৃতিক রাত। অধিকাংশ ঘরে জ্বলত কেরোসিনের কুপি, টিনের তৈরি-গায়ে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের মতো হাতল। অপেক্ষাকৃত বিত্তবানের ঘরে জ্বলত হারিকেন লণ্ঠন। হারিকেন তখন আসত বিদেশ থেকে। আমেরিকার তৈরি ডিজ হরিকেন ছিল তখন খুব বিখ্যাত। আর বিখ্যাত ছিল বাদুড় মার্কা হরিকেনের কাচ। ডিজ হরিকেন প্রথমে আসত ঝকঝকে পিতলের। পরে স্টিলের। কুপি জ্বলত লাল কেরোসিনে আর হারিকেন সাদা কেরোসিনে। রোগীর ঘরে জ্বলত রেড়ির তেলের মাটির প্রদীপ। থাকত পিলসুজের ওপরে। পরে আসে বায়েজিদ আর চাদ হারিকেন। ঘরে ঘরে সর্বত্র জ্বলে ওঠে হারিকেনের আলো।
যদিও নতুন চাদ দিয়ে শুক্লপক্ষের শুরু। কিন্তু ঈদের নতুন চাদের অবস্থা-এই দেখিলাম সোনার ছবি আর দেখি নাইরে। নতুন চাদ দেখার উত্তেজনা তখনকার শিশুদেরও ছিল-তবে বাড়িরছাদে দাড়িয়ে নয়, মাঠের পাশে দলবেধে দাড়িয়ে। আসলে তখন কটা বাড়িতেই বা ছাদ ছিল! যা-ই হোক, তারপরই নামত অন্ধকার। অবস্থাপন্ন বাড়ির উটোনে জ্বলত পেট্রোমাক্স লাইট, অর্থাৎ হ্যাজাক কিংবা হ্যাচাক বাতি। সে উঠোনে কেবল গল্পই চলত, কে কোন জিনিস কোন দামে কিনেছে তার বিবরণী নয়। তারাবির নামাজ নেই। অতএব গল্প শোনা আর মাঝেমধ্যে উঠে গিয়ে নতুন জামা-জুতো শুকে আসা অথবা জুতোটা আর কেউ পরে দেখার চেষ্টা করেছে কি না তা পরখ করা। ঈদ ঘিরে দু-তিন দিন ছিল বালক-বালিকাদের জন্য সত্যিই পুলকমিশ্রিত লেখাপড়ার বালই নেই এমনকি চিন্তাটাও উব যেত মাথা থেকে। কোথায় খাতা কোথায় কলম-কোনো কিছুরই বালাই নেই। তবে আতঙ্ক হতো ঈদের পরদিনই। রোজার ছুটির দিনগুলোর হিসাবে ইংরেজি আর বাংলা হাতের লেখা এবং আনুপাতিক হিসাবে অঙ্ক কষার হিসাব রাখতে ঘাম ছুটে যেত তখন ছিল দোয়াত-কলম আর ব্লটিং পেপারের যুগ। লেখায় তত গতি ছিল না।
নরুন কী? একালে ছেলেমেয়েকে নরুন বোঝাতে হবে নরুণের ছবি এঁকে তবে এ ছবি আঁকতে ডাকতে হবে প্রবীণকে। কারণ গার্হস্থ্য-উপকরণের তালিকা থেকে নরুন অন্তর্হিত হয়েছে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে। ঈদের আগে আগেই একবার করে হাজির হতো গ্রামের নাপিত। তার কাজ ছিল চুলের হাঁটুছাঁট-অর্থাৎ বালকের মাথা তার দু হাঁটুর মাঝে আটকে রেখে চুল ছোট করে কামানো আর নরুন দিয়ে নখ কেটে দেওয়া। নরুন তখন বাড়িতেও থাকত, নাপিতের কাছেও থাকত। নাপিতের নরুন নিয়ে তাই প্রবাদ তৈরি হয়েছিল-নাপিত দেখলে নখ বাড়ে। নাপিতের নরুন ফোঁড়া কাটার কাছেও ব্যবহৃত হতো। মানুষের তখন ইনফেকশনভীতি ছিল না বললেই চলে। ইনফেকশন দেখা দিলে ব্যবস্থা ছিল সিবাজল ট্যাবলেট। অনেক রোগের ঔষধ তখন গ্রামের মুদি দোকানেই বিক্রি হতো। সিবাজল ট্যাবলেট, ম্যালেরিয়ার প্যালুড্রিন ট্যাবলেট, পাঁচড়া বা চুলকানির কন্ডুদাবানল মলমের জন্য জন্য তখন বাজারে ডাক্তারখানায় ছুটতে হতো না। যিনি ঔষধ বিক্রেতা তিনিই ডাক্তার, তাই ফার্মেসি বা ঔষুধের দোকান তখন গ্রামেগঞ্জে ডাক্তারখানা নামেই বেশি পরিচিত ছিল। তবে ডাক্তারের একজন কম্পাউন্ডার থাকতেন।
ঈদের নামাজ কয়টায় শুরু হতো প্রাকৃত প্রবীণদের অনেকেরই আজ তা মনে নেই। ঈদগাহ তখন ছিল না পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় বা গ্রামে গামে। গামের বেলায় অনেক ক্ষেত্রে দেখা যেত, চার-পাঁচটি গ্রাম মিলেই একটা ঈদগাহ। ঈদের নামাজ হলেও পাঁচ গ্রামের মানুষ কিছুতেই একসঙ্গে জড়ো হতো না। মানুষ আসছে তো আসছেই। সময়ের বালাই নেই ঈদগাহে পৌঁছাতে দেখাগেল দুজন পাশের জমিতে তখনো লাঙল দিচ্ছে। ধরে নিতে হবে, ওই দুজন কাপড়চোপড় পরে না আসা পর্যন্ত ঈদের নামাজ শুরু হবে না। নামাজে দাঁড়িয়েও মোড়ল মাতব্বররা চারদিকে তাকিয়ে খোঁজ খবর নিতেন তাঁর পাড়ার লোক ঠিকমতো পৌঁছেছে কি না। তাঁদের পাড়ার পথে একজন দেখরেন, দূরে ছায়ার মতো দুজনকে দেখা যাচ্ছে। অতএব নামাজেদাঁড়িয়েও তাদের জন্য অপেক্ষা করো বিশ মিনিট। গ্রামে তো বারোটা বাজার আগে নামাজ শেষ হওয়া অসম্ভব ব্যাপার ছিল। তবে এত কেউ বিরক্ত হতো না। ওই নামাজে দাঁড়িয়েই নানা রকম হাসিঠাট্টার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দিতেন অন্যের জন্য প্রতীক্ষার বাকিটা সময়। ইমাম সাহেবেরা এখনকার মতো জমিয়ে ওয়াজ করতে পারতেন না। সময়টা তাই হাসি-মশক রাতেই কাটত। বাচ্চা নামাজিদের ফুর্তি তো ঈদগাহে সেদিন অন্তহীন। ঈদের পুলক সেদিনও তাদেরই ছিল। নামাজের পরে তো আরও আনন্দ।
ঈদের সকালটা থাকত অস্থিরতায় ভরা। ছোটদের গোসলপর্বটা অন্যান্য দিনে সারতে হতো দুপুরের আগে। কিন্তু ঈদের গোসল সকালেই হওয়া চাই। অস্থিরতা সেই গোসল নিয়েই। গ্রামে কিংবা মফস্বলে শ্যাম্পুর চল তখনো শুরু হয়নি সাবানই ছিল দেহ ও কেশের একমাত্র ভরসা। সাবানেরও তখন বাহার তেমন ছির না। খোসপাঁচড়া ঘায়েলের জন্য লাইফবয়ের বেশ খ্যাতি ছিল। সুগন্ধি সাবান বলতে লাক্স অথবা রেক্সোনা। পরে যুক্ত হয় তিব্বত এবং গ্লিসারিন সাবান পরিবারের জন্য সুগন্ধি সাবান কেনা হতো সাধারণত একটা, বড়োর দুটো। সাবানে বড়দের অধিকার ছিল সর্বাগ্রে। পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি হলে সেই সাবান নিয়ে পড়ে যেত কাড়াকাড়ি। গোসলপর্বটা কে কত দ্রুত শেষ করতে পারে, তাই নিয়ে চলত প্রতিযোগিতা।
সৌখিন পরিবারের মেয়েরা মাথার চুল ধোয়ার জন্য ব্যবহার করতেন রিঠার কষ। একমুঠো শুকনো রিঠার খোসা আগের রাতে ভিজিয়ে রাখা হতো। সকালে সেটাই হয়ে যেত শ্যাম্পু। রিঠার কষে পশমি কাপড়ও ধোয়া যেত। ভেজানো রিঠার কষে চুল হতো বেশ ঝরঝরে। গোসলের পরই শুরু হাতো ঈদের সকালের নাশতা কিংবা খাবার।
ঈদ-উল-ফিতরের আরেক নাম রোজার ঈদ। তবে বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে এই ঈদ সেমাইয়ের ঈদ নামেও বহুল পরিচিত। ঈদ মানেই সকালের খাবারে এবং সারা দিন অতিথি আপ্যায়নে সেমাই। বাংলাদেশে সেমাই কেবলই মুসলমানদের খাবার। হিন্দুদের মিষ্টান্ন দ্রব্যের তালিকায় সেমাই নেই। সেমাই নামটাই বেশি প্রচলিত, তবে সিমুই, সেঁওই ইত্যাদি নামও অনেক অঞ্চলে শুনতে পাওয়া যায়। ঈদের দিনে কারও বাড়িতে সেমাই নেই, এর চেয়ে পরিতাপের বিষয় আর হতে পারে না।
সেমাই কি কেবলই মুসলমানদের খাবার? এ ব্যাপারে খাদ্যতত্ত্বের ইতিহাস বাদ দিয়ে প্রথমে শব্দতত্ত্বের ইতিহাস অনুসন্ধান করা যেতে পারে। ভাষাবিজ্ঞানী সুনীতিকুমার চট্ট্রোপাধ্যায় ‘সেমাই’ শব্দের উৎপত্তি নির্দেশ করতে গিয়ে জানিয়েছেন, গ্রিক ‘সেমিদালিস’ শব্দ থেকে ‘সেমাই’ শব্দের উৎপত্তি।
সেমাই শব্দটা আফগানিস্তানে সেমিয়া, পাকিস্তানে সেওঁইয়া নামে চলে। ইরানি খাদ্যতালিকাতেও সেমাই দেখতে পাওয়া যায়। পোলাও, বিরিয়ানি, কোর্মা, কোপ্তা, ফিরনি ইত্যাদি মুসলমানি খাদ্য ও শব্দ যে ইরান-তুরান পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তা আর প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না।এগুলো আসার গতিপথের হদিসও সহজে নির্ণয় করা যায়। বলে দেওয়া যায় সময়টাও।
তবে সেমাইকে মেলানো কঠিন। শব্দের মতো খাদ্য হিসেবেও কি সেমাই গ্রিক খাদ্য? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হোঁচট খেতে হয়। যদি গ্রিক খাদ্যই হয়, তাহলে হিন্দুদের খাদ্যতালিকায় সেমাই অবাঞ্ছিত থাকার কথা নয়।
ইউরোপ শর্করা বা মিষ্টির দেশ নয়। গুড়, চিনি, মিছরি সৃষ্টিতে ইউরোপের কোনো অবদান নেই। ঐতিহাসিকদের মতে, গুড়ের আদিস্থল গৌড় আর ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, চিনি চীনের এবং মিছরি বা মিসরি মিসরের সৃষ্টি। এই হিসেবে সেমাই শব্দ হিসেবে গ্রিক হলেও খাদ্য হিসেবে গ্রিক নয়। কারণ গ্রিকদের খাদ্যতালিকায় মিষ্টান্ন-দ্রব্যের অবস্থান অতি নগণ্য, যদিও মসর অধিকারের ফলে শর্করার সঙ্গে তাদের পরিচয় অনেক আগেই ঘটেছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সংস্কৃত এই শর্করা শব্দ ইরান-আরব মুলুক ঘুরে ইংরেজিতে হয়েছে সুগার, জার্মানে চৎসুকার।রান্না হওয়ার আগে সেমাই হলো ময়দার তার ময়দার এই তার অনেক কাল আগে থেকেই অনেক দেশে প্রচলিত। তবে সেসব দেশে ময়দার তারর খাবার মিষ্টি নয়, লবণাক্ত। সেমাইয়ের প্যাকেটের গায়ে ভার্মিচেল্লিজ নামে ইংরেজিতে যা লেখা থাকে তার সঙ্গে বাংলাদেশে রান্না করা সেমাইয়ের কোনো মিল নেই। ভার্মিচেল্লি ইতালীয় খাবার।
মিষ্টান্ন হিসেবে নয়, ময়দার তাররূপে গ্রিক সেমিদালিস আমাদের সমোই হতে পারে। একদা ইরান-তুরান-আফগানিস্তান গ্রিকদের অধিকারে ছিল। কালে কালে সেসব দেশে হয়তো সেমিদালিস রান্নার প্রকরণ পরিবর্তিত হয়ে যায়। সেমিদালিস হয়ে ওটে মিষ্টান্ন-দ্রব্য। তারপর পোলাও-কোর্মার পথ ধরে সেমিদালিস প্রবেশ করে ভারতবর্ষে।স্বাদের পরিবর্তনের সঙ্গে নামেরও পরিবর্তন ঘটে। পোলাও-কোর্মা, ফিরনি-জরদার মতো সেমাইয়ের গায়ে লেবেল পড়ে মুসলমানি খাবার ।
ঈদে সেমাই অপরিহার্য হলেও সুদূর মফস্বল কিংবা গ্রামে ষাট-সত্তর বছর আগে ঢাকা-কলকাতার মতো রেডিমেড সেমাই সহজলভ্য ছিল না। বাড়ির মহিলাদেরই  তৈরি করতে হতো ঈদের সেমাই। হাড়ি বা কলসি উপুড় করে হাতের অপূর্ব দক্ষতায় তারা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নামাতেন ময়দার তার। নানা রকম তার ধাচ ছিল। টুকরো সেমাই তৈরি হতো পিড়িতে হাত ঘুরিয়ে।পরে এল পিতলের তৈরি সেমাইকল। বেশ কয়েকটা ছাট ছিল সে কলে-কোনোটা মিহি, কোনোটা মাঝারি, কোনোটা মোটা। সেমাইকলের হাতল ঘোরানোর দায়িত্ব পড়ত ছোটদের ওপর। এটি ছিল তাদের বাড়তি ঈদ আকর্ষণ।
অর্ধশতাব্দেরও বেশি আগের সাধারণ মানুষের ঈদের কথা বলতে গিয়ে এত কথা বলা। ঈদ এমনিতেই শিশুদের আকর্ষণের বিষয় ছিল। আর তাতে ছিল অকারণ পুলক। তার জন্য অভিভাবককে বাড়তি পয়সা গুনতে হতো না। মাঝেমধ্যে প্রশ্ন জাগে, এখনকার শিশুদের সঙ্গে তখনকার শিশুদের তফাতটা কী? আদৌ কি কোনে তফাত তৈরি হয়েছে? তখনকার শিশুরা তো অল্পতেই তুষ্ট হতো। এখনকার শিশুরা হয় না? ঝা চকচকে বেশি দামের নতুন জামা-জুতো শিশুরা চয়, নাকি মা-বাবাই সাধ করে কিনে দেন? চাহিদাটা তৈরি করে দেয় কে?
আগের ঈদ মনে হতো শিশুদের। এখনকার ঈদের আনন্দটা বোধ করি বড়দের। লক্ষাধিক টাকা দামের শাড়ি, আরও বেশি দামের ভিনদেশি লেহেঙ্গা, কয়েক সহস্র টাকা মূল্যের পাঞ্জাবি-এগুলো কি শিশুদের পরিধেয়? এখনকার ঈদের পুলক দাম দিয়ে কেনা। অকারণ পুলকের কথা ভাবাই যায় না।  

স্মৃতির শিকড়ে ফেরা (রুদ্র তারেক / গ্রহন্থালোচনা)

দু:খময়ী শ্যামবর্ণ রাত।।
রকিবুল হাসান।।
বটমূল।। আগস্ট ২০০৮।। মূল্য ৭০ টাকা।


কবি রকিবুল হাসানের দু: খময়ী শ্যামবর্ণ রাত নান্দনিক প্রচ্ছদ ও ঝকঝকে ছাপা অফসেট কাগজের সুন্দর একটি কবিতার বই, বইটি যে বাহ্যিক সোন্দর্যে অনন্য হয়ে উঠেছে তাতে করে মনে হয় যে, একমাত্র কবিতার বই-ই এমন পরিছন্ন পরিচর্চার প্রমান পাওয়া সম্ভব। হয়তো এ কথাতে খানিকটা পক্ষপাত দুষ্টুতা থাকতে পারে। 
পুরো কাব্যগ্রন্থ জুড়ে অনুভব হয় কষ্টজ চিৎকার, স্মৃতির শিকড়ে তার বারবার ফিরে যাবার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। শাহরীক জীবনের রুঢ় বাস্তবতায় যখন সমস্ত আবেগ বেগ-এ রুপান্তরিত হতে হতে কবি বিপর্যস্ত, তখন তিনি স্মৃতির ভেতর বিরাণ পাঁকা মাঠ আবিস্কার করে সেখানে তিনি দু-দন্ড বিশ্রাম নিয়েছেন। একটা অভিনব ও দারুণ চিত্রকল্প পাওয়া গেলো গ্রন্থের প্রথম কবিতায়-বড় চাচা হাকিম শেখ ডালির ভেতর আমাকে বসিয়ে মই দিচ্ছেন/চারা ধানের জমিতে ভয়ে ডালি ধরে কাঁপছি এখনো.../ এই যে তিনি এখনো কাঁপছেন স্মৃতি কতখানি জীবন্ত হয়ে উঠলে এমন হতে পারে তা অবশ্যই পাঠককে ভাবাতে বাধ্য। স্মৃতির বর্ণনা স্বাভাবিক, কিন্তু এই যে সেই ছোট্ট কিশোরের ভয়ে ভয়ে কেঁপে ওঠা ডালির ভেতর, কেননা মই তো চলিঞ্চু মইয়ের নিচে মাটির খন্ড কিংবা কাদার তাল সমান হয়ে যাচ্ছে। এবং ভয়, সে পড়ে যাবে না তো? কবি আজও কেঁপে চলেছেন, আমরা এই পাঠকরাও ঠিক এমনটিও হয়তো কাঁপি কখনো কখনো। আসলে বুকের ভেতর থেকে না এলে সাহিত্য বিশেষত-কবিতা,  বোধহয় কখনো-তা প্রকৃত কবিতা হয়ে ওঠে না। মা প্রত্যেক কেই তো খাবারের জন্য ডাকে কিন্তু সেটাও কবিতা হয়ে ওঠে তখনি, যখন মায়ের সেই ডাকটি হুবুহু কবিতায় উঠে আসে-বাপ আর কতো জ্বালাবি?/আসি ভাত খ্যায়া নে কচ্চি,/ প্রত্যেক পাঠকেই মনে করিয়ে দেবে তার নিজস্ব স্মৃতির ব্যথাময় অংশ সমূহ, প্রত্যেকেই একবার ফিরে আসবে শৈশব-কৈসর থেকে। 
কাব্য গ্রন্থের দ্বিতীয় কবিতা, আসবি তো বৈশাখে। মা অপেক্ষায় থাকে ছেলে আসবে ঢাকা থেকে, তিনি চৈত্র মাস থেকেই অপেক্ষা করে কেননা ছেলে বৈশাখে আসবে। মা চোখে পানি মুছে মনে মনে বলে-বাবা, এবার সত্যি আসবিতো বৈশাখে? 
দু:খময়ী শ্যামবর্ণ রাত কবিতাটি সুন্দর একটি ভাবনাকে ঘিরে পল্লবিত হয়েছে। মানুষ এখন যেনো প্রাণহীন বধির পুতুল/শামুকের মতো লুকিয়ে নিচ্ছে নিজেকে/ শেষ লাইনে-জানি তবু একদিন সব আঁধার মুঠোয় ভরে/ জেগে উঠবেন এ কালের কোনো এক বিপ্লবী বাঘা যতিন। জীবন যাপন কবিতাটি পাঠককে বেশ ভাবিয়ে তোলে। নতুন করে বেশ কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খায় পাঠকের মনে। অসাধারণ একটি কবিতা। কতোদূর থাকো, কেন থাকো কবিতাটিতে চমৎকার স্মৃতিছবি উঠে এসেছে। কয়া, খলিসাদহ, শিলাইদহ ইত্যাদি গ্রাম গুলো, বাংলাদেশের অন্যান্য সজীব প্রাণবন্ত গ্রামের মতোই। তবু-এই কবিতাটিতে ঐসব গ্রামের একনিবিড় সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলেরপরিচয় পেয়ে গর্বিত হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্র-লালন পূন্যভূমী কুষ্টিয়া জেলার এই গ্রামগুলোর একপাস পদ্মা ও অন্য পাসে গড়াই নদী প্রবাহিত হবার ফলে বেশি বেশি সবুজে সবসময় সবুজ হয়ে থাকে এবং ঊর্বর। কবিশাহরীক সন্ধ্যার ছাদে দাঁড়িয়ে সেই প্রাণবন্ত উৎসব উচ্ছল গ্রামের খোঁজে স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান, কেননা স্পস্টতই শাহরীক জীবন ব্ড্ড যন্ত্রণাকর হয়ে ওঠে মানুষের কাছে কখনো কখনো, তখন স্মৃতি বা স্বপ্ন ছাড়া কারোরই বোধহয় গত্যান্তর থাকে না। 
প্রথম কবিতা কবিতায় আমরা খুঁজে পাই এক মফস্বল শহরের তরুণ কবিকে  যিনি তার প্রথম কবিতা খানি লিখেছিলেন প্রেয়সীর রক্তাভ ঠেঁটে। স্থানটি রিবিলি নদী-তীর ওপারে ধ্যানমগ্ন বটবৃক্ষ সামনের নদীতে বালুর মেদ এ সবই প্রত্যেক পাঠক নিজের নিজের আপন বিষয় ভেবে প্রীতি হবে আর এখানে কবিতার সার্থকতা। 
একছাদ পৃথিবী কবিতায় আমরা দেখতে পাই ধারাবাহিক স্মৃতি কাতরতা যা অন্য কবিতাগুলোতে উপস্থিত। একটি ভালো কবিতা। অনুভবে খুব বেশী সত্য বলে মনে হয় এবং বেঁজে ওঠে এই লাইনটি- জানালায় মুখ রেখে এখনো কি খোঁজো সেই পাখি-মেঘ ফাটা রোদে ভাঙাচোরা সাইকেলে গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে জবুথুবু হয়ে ছুটে যেতো তোমার জানালা ঘেঁষা কাঁচা পথে-। বিধবা বোনের কাছে চিঠি একটি আশ্চর্য হৃদয় ভাঙা কবিতা। এখানে উঠে এসেছে পুরুষ শাসিত সমাজের বিকৃত জঘন্য প্রবৃত্তি। নিদারুণ পাশবিকতা। কবি এখানে, বোনের মাথায় নরম হাত বুলিয়ে সাহস করে দাঁড়িয়ে নতুন করে বাঁচার কথা বরেছেন। 
তোমার রকম একটি সমকালীন বাস্তব কবিতা। কবিতার শরীরে সেঁটে থাকা শব্দের গাঁথুনি কী রকম পরিবর্তিত হয় তার উদাহারণ দেবার মতো লাইন যেমন-নানা বর্ণের সিমের মতোই প্রেমিক পাখিরা এখন/ইচ্ছের পুতুল যেনো-রঙধনু মেঘবতী শরীরে তোমার। 
একজন সত্যিকার কবির মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত স্বকীয়তা ও মৌলিক সৃষ্টিশীলতার স্ফুরণ ঘটানো পাহাড় তলী থেকে শ্যামল আনা। কবিতায় ব্যবহৃত উপমা অলংকার খুবই সামঞ্জস্য পূর্ণ তাই এই কবিতাটি সত্যিকার ভালো একটি কবিতা হয়ে উঠেছে পাঠকের মনে। শামসুর রাহমানকে নিয়ে কবিতাটি লেখা বলে কবিকে ব্যক্তিগত অভিনন্দন। কালো বিড়াল কবিতাটি বর্তমান দেশের অস্থির পরিস্থিতির বহি:প্রকাশ। মাদকের ছোবলে তরুণ সমাজ তথা গোটা। দেশের মেরুদন্ডের প্রতি যে আঘাত আজও দৃশ্যমান তার দারুণ চিত্রায়ন এ কবিতা টি। কবি প্রশ্ন করেছেন, কারা শেষে এসব বিড়াল? পুরো কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতাই কবির ফেলে আসা সবুজি গ্রামের সেই সেই মেঠোপথ, লাউজাংলা, ধুলোমাখা পথ, গোপীনাথের মেলা, লালন মেলা শিলাইদহের মেলা বকুল তলা, প্রতিক্ষীত জানালা, গড়াই, পদ্মা, আমগাছ, রঙীন কাগজে সাজানো পথ, নৌকার ছৈ, বাজার, নদীঘাট, সে সব অনুসঙ্গ ঘুরে ফিরে এসেছে। যদিও কাব্যগ্রন্থের নাম দু:খময়ী শ্যামবর্ণ রাত তবু অধিকাংশ কবিতায় সেই ফেলে আসা স্মৃতির রক্তাক্ত আচড় বিশেষ ভাবে লক্ষনীয়। 
সবশেষ কথা- কাব্যগ্রন্থর সবগুলো কবিতাই পাঠক সমাজে বাহবা পাবে বলে আমার বিশ্বাস।

বাবা (আতিক হেলাল / ছড়া)

বাবার কাছেই অক্ষর জ্ঞান,
লিখতে, পড়তে শেখা;
তাঁর কাছে কতো ঋণী আছি, সেটা
সম্ভবই নয় লেখা।
বাবার কাছেই হাঁটা-চলা করা,
দুনিয়া দেখাটা শুরু
তিনিই প্রথম শিক্ষক আর
তিনিই আমার গুরু।
বাবার কাছেই যতো আব্দার,
জীবনের শত দাবী-
সব মেনে তিনি জীবন-নদীতে
খেয়েছেন শুধু খাবি।
বাবার কাছেই পরম মমতা,
শাসন-আশ্রয় পাই
'বড়' হয়ে গেছি, ভাব নিয়ে তবু
বাবাকেই ভুলে যাই।

বাবার হৃদয়ে অনেক কষ্ট,
অনেক বেদনা জমা
তারপরও জানি পুত্রকে তিনি
করবেন ঠিকই ক্ষমা।




কবিতার বই (নাসের মাহমুদ / ছড়া)

এটা পুড়ে
সেটা হয়
মা পুড়ে
বেটা হয়
দিন পুড়ে
রাত হয়
ঘাম পুড়ে
ভাত হয়
বন পুড়ে
ছাই হয়
মন পুড়ে
নাই হয়

কবি পুড়ে হই-
কবিতার বই

ইয়াসিন (নাসের মাহমুদ / ছড়া)

ইয়াসিন
দুই দিন
মাঠে গিয়েছিলো
ইয়াসিন
দুই দিন
ঘাটে গিয়েছিলো
ইয়াসিন
দুই দিন
হাটে গিয়েছিলো
ইয়াসিন
একদিন
ভাত চেয়েছিলো
সেই দিন
ইয়াসিন
গুলি খেয়েছিলো

এক ছিল ছড়াকার (রফিকুর রশীদ / ছড়া)

এক ছিল ছড়াকার
মেজাজটা কড়া তার
একদিন দেখা গেল
হাতে হাতকড়া তার।

কী ব্যাপার! কী ব্যাপার!
বেচারা যে ছড়াকার!
কী এমন দোষ তার?
তার উপর রোষ কার?
খোঁজ নিয়ে জানা গেল
তার যতো কারবার-
রাজাকে সে রাজা বলে মানে না
 রাজ-দোষ ঢেকে রাখা জানে না,
উল্টো সে ছড়া লেখে
তাই নিয়ে বারবার।

হতভাগা ছড়াকার!
অভিযোগ শুনেটুনে
চোখ ছানাবড়া তার।

সত্যি যা তাই লেখে
নয় মনগড়া তার,
তবু দেখি কাল হলো
প্রতিবাদী ছড়া তার।


সেখানে তোমার সুর, সেখানে মাটির গান (ইয়াসির আজিজ / কবিতা)

আর যেটুকু আলোর আভা মোমে
তাতেই তোমার বুক, মধু, স্মৃতি
আর যেটুকু পথের অবশেষ
সেখান থেকেই শুরু-রাত্রি, আত্নরতি

আর যেখানে নদীর গায়ে নদী
আর যেখানে সমুদ্র শুধু হু হু
স্বপ্ন মেঘে দোলে জাগরণ
ভেসে আসে কোকিলের কুহু

আর যেখানে ব্যাকুল বনভূমি
সবুজ টিয়ে সবুজ টিয়ে জড়াজড়ি
সেখানে তোমার সুর, সেখানে মাটির গান
জন্ম আর মৃত্যু নিয়ে দরাদরি


,

আলেয়া (শিহাব বাহাদুর / কবিতা)

আলেযাদের বাড়ির সীমানায় আমার দু:খ ছিল
আলেয়াদের উঠানে মাধবী ফুটেছে
সে কি আবার দু:খ বিলাবে

বর্ষার উৎসবে মেঘ ভাসালো আষাঢ়ের নদী
শ্যাম সীমায় আলেয়ার কথা
সে কথা ব্যথার ভরানদী জানে
সে কি আবার বর্ষা ঝরাবে

আলেয়াদের উঠানে বর্ষা নেমেছে
আলেয়াদের উঠানে মাধবী ফুটেছে


কোথায় তুমি থাক! মূল: এলিজাবেথ বেরেট ব্রাউনিং অনুবাদ: হুমায়ুন কবির (সংগ্রহ ও ভূমিকা: মাসুদ রহমান / অগ্রন্থিত রচনা)

[অসাধারণ মেধাবী ছাত্র, প্রভাবশালী সর্বভারতীয় রাজনীতিক, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ, অনন্য সংগঠক, স্মরণীয় সংবাদপত্রসেবী ইত্যাদি নানা পরিচয়ের পাশাপাশি হুমায়ুন কবির (১৯০৬-১৯৬৯) সাহিত্যিক হিসেবেও বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছিলেন। বলা চলে, তিনি ছিলেন একজন সব্যসাচী সাহিত্যিক।তাঁর একমাত্র উপন্যাস ‘নদী ও নারী’ (১৯৫২) বিশেষ সমাদর লাভে সমর্থ হয়েছিল। এটি প্রকাশের সাত বছর আগে বেরিয়েছিল এর হুমায়ুন কবিরকৃত ইংরেজি সংস্করণ Men and Rivers । হুমায়ুন কবিরের উল্লেখযোগ্য ‘ধারাবাহিক’ প্রবন্ধ-পুস্তকের মধ্যে রয়েছে ‘ইমানুয়েল কান্ট’(১৯৩৬), ‘বাঙলার কাব্য’ (১৯৪২), ‘মাকর্সবাদ’ (১৯৪৮), ‘শিক্ষক ও শিক্ষার্থী’ (১৯৫৭), ‘দিল্লী ওয়াশিংটন মস্কো’ (১৯৬৪) ইত্যাদি। সাহিত্য-দর্শন-শিক্ষা প্রভৃতি নানা বিষয়ে ইংরেজিতেও তাঁর পুস্তক রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য Kants on Philosophy in General.(1935), Poetry Monads and Society (1941), Sarat Chandra Chatterjee, First editon (1942), Muslim Politics (1906)-1942) (1943), Our Heritage (1947), Student Indiscipline (1954), Science Democracy and Islam and Other Essays (1955), Britain and India (1960).

স্বকালে বাংলা ভাষার একজন প্রধান কবি হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। কেউ কেউ যেমন তাঁকে রবীন্দ্রানুসারী কবিদের মধ্যে বিবেচনা করেছেন, তেমনি কল্লোলের বা তিরিশের কবি হিসেবেও বর্ণিত হন কোনও কোনও আলোচনায়। কবির বেশ কিছু ইংরেজি কবিতার বঙ্গানুবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে ইংরেজ রোমন্টিক-ভিক্টোরিয়ান কবি থেকে শুরু করে আছেন বিশ শতকের টি.এস.এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫)। তবে তাঁর যে অনুবাদ এখনও মুখে মুখে ফেরে সেটি শিশুতোষ-কবিতা। আমরা চার্লস কিংসলির (১৮১৯-১৮৭৫) Sands of the Dee অবলম্বনে রচিত ‘মেঘনায় ঢল’ কবিতাটির কথা বলছি। এর বাইরে আমরা তাঁর আর একটি শিশুতোষ-অনুবাদমূলক কবিতার সন্ধান পেয়েছি। এর রচয়িতা এলিজাবেথ্ বেরেট ব্রাউনিং (৬ মার্চ ১৮০৬-২৯ জুন ১৮৬১)। 

এলিজাবেথ্ বেরেট ব্রাউনিং ভিক্টোরিয়ান যুগের অপর বিখ্যাত কবি রবার্ট ব্রাউনিংয়ের (১৮১২-১৮৮৯) প্রেমিকা-স্ত্রী। বিবাহের পূর্বে তাঁর নাম ছিল এলিজাবেথ্ মলটন বেরেট। ইংল্যান্ডের ডারহামে জন্মগ্রহণকারী এলিজাবেথ্ আট বছর বয়সে গ্রীক ভাষা শিখে নেন এবং বার বছর বয়সে একটি মহাকাব্যিক কবিতা লেখেন। পনেরো বছর বয়সে তিনি স্পাইনাল কর্ডে আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং পরবর্তী জীবন একরকম চিররুগ্ন ছিলেন।একারণে প্রেমিক ব্রাউনিংয়ের বিবাহ প্রস্তাবে এলিজাবেথ তিনি যেমন প্রথমে মত দেন নি, তেমনি তার পিতাও সম্মত ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত প্রেমের জয় হয়। তাঁরা গোপনে বিয়ে করে ফ্রান্সে পালিয়ে যান। পরে সেখান থেকে ইটালিতে গিয়ে সুখের নীড় গড়ে তোলেন। এলিজাবেথ্ ইটালির ফ্লোরেন্সেই মৃত্যুবরণ করেন। বলা হয়ে থাকে, ব্রাউনিং তাঁর শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতা লিখেছেন ১৮৪৫ সালে-এলিজাবেথের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কালে এবং ১৯৬১ সালে- এলিজাবেথের মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে। তবে ব্রাউনিংয়ের কবিতায় যে ঈশ্বরে বিশ্বাস ও আস্থা লক্ষ্য করা যায়, তাতে এলিজাবেথের প্রভাব যে ক্রিয়াশীল ছিল অন্তত নিম্নোক্ত কবিতা থেকে তার ইঙ্গিত মেলে। এলিজাবেথ অবশ্য সনেট রচয়িতা হিসাবেই বেশি খ্যতিমান। তাঁর বিখ্যাত ককাব্যগ্রন্থ Sonnets From the Portuguese. শিশুদের প্রতি বিশেষ সংবেদন ছিলেন এলিজাবেথ। এর সাক্ষ্য The Cry of the Children- যেখানে শিল্পকারখানায় নির্যাতিত শিশুদের পক্ষে প্রতিবাদের সুর ধ্বনিত হয়েছে। নিচের কবিতায় শিশুদের মনমানসিকতার সাথে কবির ঘনিষ্ঠ পরিচয় ও তা প্রকাশের ক্ষেত্রে মুনশিয়ানার স্বাক্ষর আছে। হুমায়ুন কবিরও যথারীতি শব্দচয়ন, বাকবিন্যাসে তাঁর অন্যান্য অনুবাদের মত এখানেও দেশীয় আবহ নির্মাণ করেছেন। এটি পাওয়া গেছে ‘শিশুভারতী’ সংকলনের ১ম খন্ডে (কলকাতা, ১৩৩৯) ‘কবিতা চয়ন’-বিভগে। কবিতাটির শুরুতে ভূমিকাস্বরুপ লেখা ছিল-‘এলিজাবেথ্ বেরেট ব্রাউনিং ইংরাজ মহিলা কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থানীয়া। তাঁহার কবিতার মধ্যে গভীর ভাব ও চিন্তাশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। ছোট শিশুর মনে ঈশ্বর সম্বন্ধে কিরুপ ধারণা জন্মে এই কবিতাটিতে তাহা দেখানো হইয়াছে’।]


সবাই বরে বিশ্বপতির 
আসন নাকি অকে উচুতে! 
লম্বা ঢেঙ্গা তাল সুপারি 
জট-ঝোলানো অশথ সারি 
তারো উপর তাকিয়ে তব 
সোনা রুপোর দীপ্তি যত 
সবি শুনি তাঁরই নিশানা 
খনির গহন অন্ধকারে 
খুঁজে খুঁজে বারে বারে 
অতল পাতাল পুরীর শেষে 
তবু কি তাঁর মেলে ঠিকানা? 

দয়াময়ের অশেষ দয়া 
মোদের ভালবাসেন কত যে! 
এই ধরণী, আকাশ খানি 
নিত্য বলে তাঁহার বাণী, 
মোদের সাথে আলো-ছায়ায় 
লুকোচুরি খেলেন সহজে! 

তবু জানি পরশ তাঁহার 
মোদের লাগি সকল ভুবনে। 
যখন যেথায় যেমন থাকি 
জানি তাহার স্নিদ্ধ আঁখি 
সকল ক্ষণে সকল কালে 
জাগায় শুভ মোদের জীবনে। 

স্বপ্নে আধেক আধেক জাগি 
মা-মণি মোর নয়ন চুমিয়া  
শুধায় যেন ঘুমের ঘোরে, 
“অন্ধকারে এমন করে- 
বলতো চুমো কে দেয় তোরে 
মানিক আমার আমার “ঘুমিয়া?”    

আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসলে (রুদ্র তারেক / কবিতা)



আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসলে
তোমার সমস্ত হিজিবিজি অক্ষাংশ দ্রাঘিমা মুছে যাবে
মেরু আর মরুর বিপর্যয়তা কেটে গিয়ে
পুরো পৃথিবীটা হয়ে উঠবে-
একটি আয়তকার গোলাপ বাগান,
স্নেহময় ভোরের শিশির আর উষার আলোকিত এভয়ে
ঠিক সেদিন থেকেই, ক্ষমাহীন বেকুব সূর্যখন্ডও
হাসতে হাসতে হবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত
নাতিশীতোষ্ণ আনন্দে বিহবলিত হবে প্রতিটি মুর্হর্ত।
আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসলে
তোমার তাম্র লৌহ প্রস্তুর যুগ একই সমান্তরালে দাড়াবে
প্রাগৈতিহাসিক আর ঐতিহাসিক একঘাটে এসে জল খাবে
বির্বতনের আলোকিত গান শুনে শুনে আধুনিক হবে
ম্যযুগের রাজকীয় খচ্চর, ও গর্দভেরা
ঠিক সেদিন থেকেই, বিত-ইতিহাসের পাতা থেকে শুর্হর্তেই উধাও হবে প্রতিটি অক্ষর, দাড়ি কমা, সেমিকোলন
নির্যাতিত মানুষের দলিলে ভরে উঠবে প্রতিটি আর্কাইভ
মিউজিয়ামের প্রত্যেকটা র‌্যাকে শোভা পাবে অনার্য মানুষের
ঘাম ও রক্তের ফলিস।
আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসলে
তুমি নিমেশেই ভুলে যাবে হাইট্রোজেন হিলিয়াম অক্রিজেনের নামাবলী
নিউক্লিয়াস ইলেকট্রন প্রোটনের শৃংখল ভেঙে তুমি ছুটবে আমাতেই
তোমার সমস্ত চৌম্বকত্ব অকেজো করে
পৃথিবীর তাবত কাটা কম্পাস নির্দেশিত করবে আমার হৃদয়কে আর-
বিদ্যুতের সমস্ত প্রবাহ এসে ঠেকবে আমাদের শিরা-উপশিরায়
ঠিক সেদিন থেকেই
আকস্মাত আবিস্কার হবে ‘‘ভালোবাসা’’ নামক আনবিক শক্তি মানবিক উতসে
আবিস্কার হবে সপ্রমাণ আটটি জলজ্যান্ত দোজখও
সাতটি ফুলেল বেহেশতের, মানুষের মস্তিস্কের কোষে।

আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসলে,
তোমার সমস্ত উপন্যাস গল্প কবিতা প্রবন্ধ নাটক
একই শব্দ উচ্চারণ করবে বারংবার
একই গানের খসড়ায় কণ্ঠ মেলাবে তারা কোরাশে
‘‘ভালোবাসা!!! ভালোবাসা!!! ভালোবাসা!!!
তোমার সমস্ত সারাংশ ভাবসম্প্রসারণ সন্ধিও সমাস
রচনা ও পত্র, অনুবাদ শব্দ ও প্রতিশব্দ
হয়ে উঠবে ক্রমে শ্রুতিমধুর রোমান্টিক গীতিকাব্য
ঠিক সেদিন থেকেই পৃথিবীর কোন অভিধানে থাকবেনা যুদ্ধ ও ধর্ষণ
শোষণ বেয়নট রাইফেল, হত্যা জুলুম
আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসলে, তুমি টের পাবে
একটি ছোট্ট নদীর প্রবাহ বুকের ভেতর
একটি দ্বিতীয় সূর্যের উড্ডয়ন রক্তের ভেতর
একটি অটুট বন্ধনের নিবিড়তা মুঠোর ভেতর
একটি প্রাত্যাহিতক ভূকম্পের আভাস স্নায়ু’র ভেতর
একটি সুরক্ষার নরম ঢালের দশটি আঙুল
স্থির অথচ
তোমার উজ্জ্বল মুখের চারপাশে।
,

নতুন কণ্ঠস্বর: একটি ব্যক্তিগত মূল্যায়ন (সাগর রশিদ / মূল্যায়ন)



নতুন কণ্ঠস্বর সমকালীন বাংলা সাহিত্য, সুপ্রভাত সাহিত্য পরিষদ, কুষ্টিয়া কর্তৃক আয়োজিত একটি বর্ণিল জীবন দর্পনের আলোক্ছটা। একটি মহতী উদ্যোগ। একটু ব্যক্তিগত অবতারণার আলোকে বলছি; ‘নতুন কণ্ঠস্বর’ এর উপদেষ্টামন্ডলীর একজন সদস্য। তাই দু’একটি না বলা কথা ব্যক্ত করে, আমার দীর্ঘদিনের বেদনাপুঞ্জের মেঘসদৃশ্য কিছু বৃষ্টি কণার আলোকপাত করবো মাত্র।
‘সুপ্রভাত সাহিত্য পরিষদ, কুষ্টিয়া’ এর সকল সদস্যই আমার পরিচিত এবং প্রত্যেকেই আমার অনুজ। কারো সাথে রয়েছে আমার রক্তের সম্পর্ক। তাই আমার স্নেহাশীষের আবেগ আজ ফল্লুধারা। হ্যা তোমাকেই বলছি, যদি তুমি চোখ মেলো বাংলা সাহিত্যের দিকে, তাহলে দেখবে জ্বলছে হাজার হাজার প্রদীপ। যার দু’একটি আজ তোমরা মেলে ধরেছো, মেলে ধরতে চেয়েছ। বুক ভরে যায় সেই আলোকের ঝরনাধারায়; সেই আলোকে ভরে যাক তোমাদের খাতার ধূসর সাদা খসখসে পাতা, প্রত্যেকের মনন, পৃথিবী ও স্বপ্নলোক। সাহিত্য হচ্ছে আলোর পৃথিবী, সেই আলোয় আলোকিত হয়ে আমি কত অসুন্দরকে সুন্দর শিল্পকলা হতে দেখেছি। সে মতো, তোমাদের এ উদ্যোগ ও বিফল হবে না।
আচ্ছা, সাহিত্য মানে বোঝ? যদি এ প্রশ্ন করি, হয়ত তোমরা অনেকে, অনেক কথা বলবে। কেউ বলবে, সাহিত্য হচ্ছে শিল্প, কেউ বলবে, একটি সুন্দর চিন্তার বহি:প্রকাশ। কেউ রবীন্দ্রনাথের চিন্তার আলোকে বলবে, সাহিত্য মানে সহিত-জীবনের সহিত সংশ্লিষ্ট সকল কিছুই সাহিত্য। আমি বলবো? তার আগে একটু ব্যক্তিগত বিষয়ে বলি-আমি যখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে, গবেষক হিসেবে নিজেকে গড়বো বলে মনে-প্রাণে ধ্যানে মগ্ন, তখন অনেকে বাঙলা পাচের মত মুখ ভ্যেংচিয়ে বলেছে ‘ও তুমি বাংলায় পড়? বাংলায় পড়াশুনা করি, একটু আধটু কবিতা-টবিতা না লিখলে হয়? কিন্তু মনে তো ভাব আসা চাই। নইলে কবিতা লিখবো কেমন করে? তাই কবিদের কাছাকাছি ঘুরঘুর করতে লাগলাম। যদি ভাব আসে এই ভেবে প্রতিদিন বিকেল হলেই শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে যেতাম। আমার এক সহপাঠি কবি বন্ধু সজীব পুরোহিতের সাথে মেলামেশার সুবাদে কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, সমুদ্র গুপ্ত, রওশন ঝুনু, নাসির চৌধুরী সহ আরও অনেকের সাথে মিশতে গেলাম। তাদের তিন টাকার চোলা মুড়ি আর দুই টাকার লাল চা খেতে লাগলাম। কিন্তু ভাব তো আসে না। কি লিখি কিভাবে লিখি, চিন্তা করতে করতে একদিন সাহস করে দু:সাহসিক একটি কবিতা লিখে ফেললাম। খুব আগ্রহ ভরে আমার কবি বন্ধুকে পড়ে শোনালাম। বন্ধু আমায় হতাশ করে বলল, ‘দোস্ত, ঢাকা শহরে কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে…..।’ কিন্তু আমি নিরাশ হয় নি। একদিন আনমনে চারুকলার সামনে বসে থাকার সময় একজন পাগলকে পথচারিদের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধারের কথা শুনে আমার মন ভালো হয়ে গেল। কি অদ্ভুত আমার মন? তার হাতে দেখেছি খবরের ছেড়া কাগজ, কোন মানুষের ছবি। ওগুলো হাতে নিয়ে কী আবোল তাবোল বকতে থাকে তার মাথা মুন্ডু কিছুই বোঝা যায় না। কিংবা বলা উচিত, তার কথা আসলে কোনদিন বুঝতে চেষ্টা করি নি। পাগলের কথা তো আর কথা নয়-প্রলাপ। সে প্রলাপে কে কবে মনোযোগ দেয়? আমরা সকলে কথায় কথায় টিপ্পনি কেটে বলে থাকি-‘ছাগলে কী না খায়, পাগলে কী না কয়?’ কিন্তু আমি বলি, ‘ছাগলে ঘুষ খায় না, আর পাগলে মিছা কথা কয় না। ’ পাগলেরাই সত্য কথা বলে, অথবা অজস্র মিথ্যার বিড়ে যারা সত্য কথা বলে তারাই পাগল। আমি সুপ্রভাত সাহিত্য পরিষদ, কুষ্টিয়া এর সকল সদস্যকে বলবো, তোমরা প্রত্যেকে এক একটা পাগল। তোমাদের এ পাগলামি কখনো যেন থেমে না যায়। এগিয়ে যাও অনাবিল এ পৃথিবীর অবারিত প্রন্তরে। 

  
মো: রশিদুল ইসলাম (সাগর রশিদ)
সভাপতি: সুপ্রভাত সাহিত্য পরিষদ, কুষ্টিয়া।  
প্রোফাইল>>

নিহত মানব ( মনি হায়দার / গল্প )

দেয়ালে ঝোলানো আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে মাথায় চিরুনী চালায় আলম। আয়নাটা অনেক দিনের ব্যবহারে তার উজ্জল রঙ হারিয়ে ফ্যাকাসে রঙ ধারণ করেছে। ছোট্ট আয়নার মধ্যে আলমের বড় মুখ ধরে না। তারপরও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মুখটাকে দেখে সে। এই এক খেলা-নিজেকে দেখা কখনও মানুষের শেষ হয় না। অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতির মধ্যে কয়েকবার মুখটাকে দেখে আলম। প্রতিদিনই দেখে। তারপরও মনে হয় না-মুখটা ঠিক আছে। কোথায় যেন একটা ঝামেলা লুকিয়ে থেকে দাত বের করে হাসছে। এইসব ভাবনার মধ্যে সে মাথায় শেষবারের মতো চিরুনী চালিয়ে ভেতরের রুম থেকে সামনের রুমে আসে। তাকায় ঘড়ির দিকে আটটা বেজে নয় মিনিট। চিন্তিত আলম সস্তা চৌকিতে বসে হাক দেয়-শিউলি?
আসছি-ভেতর থেকেশিউলির সুরেলা কণ্ঠ ভেসে আসে।
দেরী হচ্ছে-আলম তাড়া দেয়।
আলমের কথা শেষ হতে পারে না-শিউলি তিনটি টিফিন বক্স হাতে ঢোকে-এই নাও তোমার দুপুরের খাবার। গত দু তিন দিন ধরে টিফিন বক্সটাকে ভালো করে মাজতে পারি নাই, ময়লায় ধরেছে। আজকে একটু ভালো পরিস্কার করে মেজে দিলাম। তাই একটু দেরী হলো আর কি-
টিফিন ক্যারিয়ার হাতে নিতে নিতে দাড়ায় আলম-যাই? কথা বলতে বলতে দুজনে দরজার কাছে দাড়ায়। প্রতিদিনের অভ্যাস মতো পরস্পর তাকায় পরস্পরের দিকে। আরপ্রতিদিন শিউলি বলে-তাড়াতাড়ি এসো।
ঘাড় নাড়ে আলম-চেষ্টা করবো। এবং আলম লম্বা পা ফেলে এগিয়ে যায়। যতক্ষণ দেখা যায় আলমকে দৃষ্টির মীমানায় ততক্ষণ দরজায় দাড়িয়ে দেখে শিউলি। বিবাহিত এবং নাগরিক জীবনের তিন চার বছরের গড়ে ওঠা এই অভ্যাস দুজনের কেমন করে কিভাবে গড়ে উঠেছিল-কেউই জানে না। আলম জানে-পিছনে না ফিরেও, শিউলি দরজায় দাড়িয়ে আছে। ওর চোখ জোড়ার আকুল দৃষ্টি পিঠের উপর আছড়ে পরছে। এক ধরনের ভালো কিছু রেখে গেছো? শিউলি জানতে চায়।
না, সব নিয়েছি। কথা বলতে বলতে সে মানিব্যাগ বের করে তাকায় শিউলির দিকে, আলমের মুখে এক চিলতে হাসি। শিউলিও একটু অবাক। মানিব্যাগ থেকে দশ টাকার একটা নোট বের করে বাড়িয়ে ধরে শিউলির দিকে-এই টাকাটা রাখ।
হাসতে হাসতে শিউলি টাকাটা হাতে নয়-দশ টাকা দিয়া কি করবো?
আমার কাছেতো বেশি টাকা থাকে না-তাই তোমার কাছে দশ টাকা জমা রাখছি। যেদিন একশো টাকা হবে-আমাকে দিও।
সেই একশো টাকা দিয়া কি করবে? কৌতুক শিউলির কণ্ঠে।
পরে বলবো-একটা রহস্যময় হাসি মুখে বুঝিয়ে চলে যায় আলম। শিউলি ওর চলে যাওয়া দেখতে দেখতে আপন মনে হাসে-তার স্বামীটার মধ্যে ছোটখাট পাগলামী আছে। তবে মানুষের দু:খে কষ্টে মাঝেমধ্যে ভেঙে পড়ে। রাস্তা ঘাটে বাচ্চাদের ভিক্ষা করতে দেখে ও বাসায় এসে কাদে। নিজের সঙ্গে ঝগড়া করে-কেনো সে কিছু করতে পারে না! আলমের এই মর্মপীড়ন ও বেদনাকে শিউলি সম্মান করে। সংসারে কতো মানুষ-কিন্তু কতোজন তার স্বামীর মতো অনুভব করতে পারে? একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শিউলি দরজা বন্ধ করে ভেতরে ঢোকে। অনেক কাজ পড়ে আছে-তরকারি কুটতে হবে, কাপড় কাচতে হবে-আলম কাপড় কাচা সাবানের ফ্যাকটরিতে চাকরি করে।
যদিও পদের নাম ম্যানেজার-কিন্তু করতে হয় সবই। মালিক লোকটা চামারের চামার। দূর সম্পর্কের আত্নীয় বটে-শ্বশুর বাড়ির দিক থেকে। শিউলির ধারণা-তাদের মানিক মামা খুব ভালো মানুষ। কষ্ট পাবে-কিংবাভুল বুঝতে পারে ভেবে আলম কিছু জানায় না। মানিক মামা সাবানে প্রচুর ভেজাল মেশায়, মিথ্যা বলে অবলীলায়।
শোন মিয়া জামাই-পানের পিক ফেলে ট্যারা চোখে তাকায় মানিক মিয়া-ব্যবসায় দুই একটা মিচা কতা না কইলে ব্যবসা চাংগে উঠবো। তখন বৌ বাচ্চা লইয়া না খাইয়া থাকন লাগবো। বুঝলা মিয়া জামাই? আবার পানের পিক ফেলে সে-এইসব ব্যাবসা বানিজ্রের কতা বাসায় গিয়া বৌরে ফুচুর ফুচুর কইরা কইও না-কইলাম। বৌওয়ের জাগায় বৌ, ব্যবসার জাগায় ব্যবসা।
প্রথম দিকে এসব আলামত দেখে খুব কষ্ট পেতো আলম। আবেগি হলেও আলম খুব সাদাসিদে ধরনের মানুষ। ঝামেলা একদম পছন্দ করে না। প্রাণপনে চেষ্টা করে সব কাজ সুচারুভাবে করতে। তারপরও মানিক মামা কোথথেকে যে ক্রটি আবিস্কার করে বুঝতে পারে না আলম। তখন দাতমুখ খিচিয়ে এমনভাবে কথা বলে মনে হয় গহীন বনের কোন শিম্পাজ্ঞির মুখোমুখি সে। শুরুতে খুব মন খারাপ হতো-এখন হয় না। সয়ে গেছে। মানুষ আসেলে এমনই। কারখানায় মোট আটজন কর্মচারী। বিরাট একটা পোড়া বাড়িতে শহরের উপকণ্ঠে মানিক মামার এই মল্লিকা সোপ ফ্যাক্টরী। ফ্যাক্টরীর সবার সঙ্গে আলমের ভালো সম্পর্ক। কাজ করিয়ে নিতে হলে সম্পর্ক ভালো রাখতেই হয়। বিশেষ করে দবিরউদ্দিন ছেলেটা একটা আস্ত বলদ। অবসর নেই বললেই চলে। সারাদিন মুখগুজে সাবানের জ্বালামুখেশরীর বিছিয়ে কাজ করে যায়। খাটুনী অনুপাতে বেতন খুবই কম-মুখে কোন রা নেই। সবচেয়ে সচেতন ছেলে মহিম। ছোটখাট শরীরে প্রবল তেজ-মুখে কথার খৈ ফোটে। লেখাপড়া জানলে অনেক দূর যেতে পারতো। বেতন নিয়ে কথা উঠায় সেদিন মহিম হাসতে হাসতে বলেছিল-আর মাস খানেক দেখবো আমার বেতন না বাড়াইলে মানিক মিয়ারে ধরে একদিন এমন ধোলাই দেবো-হাড় মাংস আলাদা হয়ে যাবে।
আলম চকিতে এদিক ওদিক তাকিয়ে মহিমের মুখ চেপে ধরে-আর একটা কথাও না। কেরামত শুনলে চকরি নট হয়ে যাবে। দবিরউদ্দিন ময়লা দাতে হাসে।
কেরামত কই? জানতে চায় আলম।
বাজারে গেচে হ্যার বাজার করতে-জবাব দেয় দবির।
মল্লিকা সোপ ফ্যাক্টরীর এক কোনায় নিজে রান্না করে খায় কেরামত। ওদের সঙ্গে কথা বলে কম। এক ধরনের ডাট নিয়ে চলে। কেরামত মানিকমিয়ার গোয়েন্দা। প্রতিরাতে একবার মানিক মিয়ার বাসায় তার যাওয়া চাই। মানিক মিয়া তার এই মল্লিকা সোপ ফ্যাক্টরীটাকে বিরাট কিছু মনে করে-নিজেকে একজন শিল্পপতির সমান ভাবে। আর কি কি করলে গাড়িঅলাদের মতো হোমরা চোমরা একটা কিছু হতে পারবে-সেই সব ভাবে। কিন্তু সমন্যা হচ্ছে-সে একজন আকাট মুর্খ। নিজের নামটাও লিখতে পারে না। ফলে মনের গভীর গোপন বাসানা ভেতরেই থেকে যায়। আর প্রতি সন্ধ্যায় কেরামতকে নিয়ে কারখানার লোকজনদের বিরুদ্ধে অহেতুক ঘোট পাকায়।
দুপুরে দবিরউদ্দিন,মহিম, হরলাল,করিম,আলম সবাই একসঙ্গে বসে ভাত খায়। যার যার বাসা থেকে তরকারি আসে-একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে পরম আত্নীয়ের মতো খায়। এবং এই খাওয়া পর্বটার জন্য প্রত্যেকে অপেক্ষা করে প্রতিদিন। একজনের তরকারি ভাগ করে দিতে বা অন্যর তরকারি নিয়ে খেতে খেতে একে জন গভীর নৈকট্য অনুভব করে। কারো তরিতরকারি খুব উন্নত নয়-মাংস মাসে একদিন থাকলেও থাকতে পারে, মাছ মাঝে মধ্যে থাকে। নিয়মিত থাকে আলু ভর্তা, ছোট মাছের সঙ্গে কোন তরকারি। আর কিছুনা থাকলে একটা ডিম ভাজা, সঙ্গে কয়েকটি ভাজা লংকা। মহিমের তরকারি যেদিন বেশি ভালো থাকে না-সেদিন একটু দূরে বসে খাবার চেষ্টা করে। ওর আবার প্রেস্টিজ জ্ঞান বেশি। নিজেকে কারো কাছে ছোট করতে চায় না। আলম নিজেই কাছে যায়-আরে ভাই, দূরে বসলেই কি দূরে যাওয়া যায়? আলম ভাই, এই আলুভর্তা আর ইচা মাছের সঙ্গে লালশাক সবার সামনে কি করে বের করি? সহিমের কণ্ঠে শ্লেষমাখানো আর্তি। জীবনটা আর ভালো লাগে না। হ্যা হ্যা শব্দে হাসে আলম-আরে ভাই, চিন্ত কি-আমরা সবাই একই জায়গা থেকে এসেছ।
মানে?
বুঝলেন না?
ঘাড় নাড়ে মহিম-না।
আমরা সবাই নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে এসেছি। আমাদের বুক ভরা আশা আর চোখ ভরা রোদন ছাড়া কি আছে? দেন ভাবী কি তরকারি দিয়েছে-প্লেট বাড়িয়ে দেয়। আপনার সঙ্গে একদম পারা যায় না আলম ভাই-মুখে কপট হাসি ধরে রেখে তরকারি দেয় পাতে। কিন্তু আলমের মহত্বে ভেতরে দারুন খুশি মহিম। আলমকে তরকারি দিতে দেখে দু’একজন দৌড়ে আসে প্লেট হাতে-আমরা কি দোষ করলাম?
মহিমের আর একা খাওয়া হয় না। সবাই মিলে একাকার হয়ে যায়। এদের সঙ্গে কেরামত যোগ দেয় না। খেতে খেতে দবির দাতে দাত পেষে-শালা কেরামতকে ধইর‌্যা একদিন আচ্ছা মতো বাশঢালা দিতে অইবো।
কোনো? বেচারা মালিকের আবদুল আবার কি দোষ করলো? খোচা দেয় করিম। ব্যাটা লাটের লাট-আমাগো লগে খায় না! একা রানধে একা খায়-
আলম খাওয়া শেষ করে হাত মুখ ধুয়ে বসে-না দবির, এভাবে বলতে নেই।
প্লেট চাটতে চাটতে চায় দবির-ক্যান? কইলে কি অইবো?
প্রত্যেক মানুষের পছন্দ অপছন্দ আছে, আছে নিজের মতো করে থাকার অধিকার। কেরামত কোন কারণে মনে করে-সে একা খেলে ভালো খেতে পারবে। তাতে হয়তো সে মজাও পায়। আমাদের উচিত হবে না ওর ব্যক্তিগত ইচ্ছের উপর কিছু বলা।
তাইলে এক কাজ করি? দবিরের মুখে ক্রোধ।
কি?
বেচারা এতো কষ্ট করে-কেরামতের থালাবাটি ধুইয়া দেই?
আলম অবাক হয়ে দবিরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। দবিরউদ্দিনকে সবাই বলদ বলে। দবির কি তাবই? কেরামতের অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে সে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করছে। আলম কি পারবে? দবির এবং দবিরের মতো মানুষেরা এই শক্তি কোথায় পায়?
বেশ কয়েকদিন পর এক সকালে আলম অফিসের প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছে সামনের রুমে-শিউলি কখন টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে আসবে। একটা টিকটিকি ডেকে ওঠে। চমকে তাকায় আলম। খুজে বের করার চেষ্টা করছে টিকটিকিটাকে। কোথাও দেখতে পায় না। ঘরে ঢোকে শিউলি, হাতে টিফিন ক্যারিয়ার। আলমের দিকে তাকিয়ে কৌতুকের সঙ্গে হাসে।
তুমি হাসছো কেনো? বিস্মিত আলম।
টিফিন ক্যারিয়ার হাতে দিয়ে পাশে বসে-তুমি একটা সত্যি কথা বলবে?
তুমি জানো, আমি অপ্রয়োজনে মিথ্যা বলি না।
তুমি একশো টাকা দিয়ে কি করবে?
আলম চমকে ওঠে-একশো টাকা জমা হয়েছে?
ঘাড় নাড়ে শিউলি-হয়েছে।
দাও-হাত বাড়ায় আলম।
মুখে রহস্যের ঢেউ এনে প্রশ্ন ছোড়ে শিউলি-আগে বলো টাকাটা দিয়ে কি করবে?
একজনকে দেবো।
কে সে?
তার নাম জানি না।
অবাক শিউলি-দশ টাকা করে জমিয়ে একশো টাকা বানিয়ে যাকে দেবে তার নামটা জানো না! আলম অসহায়বোধ করে-শিউলি, সত্যি আমি তার নাম জানি না। তবে মাঝে মধ্যে তাকে আমি চাচা বলে ডাকি। তুমিও তাকে চেনো।
আমিও চিনি?
হ্যা। আমাদের গলি পার হয়ে মেইন রাস্তায় উঠে কিছুদূর যাবার পর একটা সিরিজ গাছ আছে না?
আছে। তারপর?
সেই সিরিজ গাছের নীচে এক লুলা বয়স্ক মানুষ বসে বসে ভিক্ষা করে। তুমি দেখেছো না? দেখেছি। আমিতো মাঝেমধ্যে তাকে দু এক টাকা ভিক্ষাও দেই।
আমি কখেনও দেই নি।
সেজন্য একশো টাকা দিতে চাও?
ঠিক তা নয়, মানুষটার চোখেমুখে এক ধরনের সৌন্দর্য আছে। আমাকে দেখলেই একটা হাসি দিয়ে সালাম দেয়। আমিও প্রতিউত্তর দেই। প্রতিদিন তাকে অতিক্রম করে অফিসে চলে যাই। অনেক রাতে এলে তাকে দেখি না। আসা যাওয়ার পথের ধারে রোদে বৃষ্টিতে তাকে দেখতে দেখতে আমার মনে একটা-থেমে যায় আলম।
থামলে কেনো? আলমের কাধে হাত রাখে শিউলি। বলো-
মানুষটা হয়তো হোটেলে কোনোদিন খায় নি একবেলা। মানুষের খাওয়া ফুটপাতে বসে দেখেছে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। আমি তাকে এই সামান্য টাকাটা দিয়ে বলবো-হোটেলে একবেলা পেট ভরে খেয়ে নেবেন। অথবা জেনে নেবো তার বাসায় ছেলেমেয়ে কেউ আছে কি না! যদি থাকে তাহলে একটা মুরগি কিনে বাসায় নিয়ে যেতে বলবো, যাতে সবাই মিলে একবেলা মুরগির সালুন দিয়ে তৃপ্তির সঙ্গে ভাত খেতে পারে। তাকে আমার পথের আত্নীয় মনে হয়। মনে হয় মানুষটাকে আগে কোথায় যেন দেখেছি, ঠিক মনে করতে পারছি না।
শিউলি?
বলো।
আমি কি পাগলামি করছি?
কে বলে তুমি পাগলামি করছো? আমারতো মনে হয় তুমি করছো জগতের সেরা একটি কাজ। আমার সাধ্য থাকলে তোমাকে অনেক বড় একটা পুরষ্কার দিতাম। পুরষ্কার দিতে না পারলেও আমি তোমার জন্য গর্বিত।
লাজুক হাসে আলম।
অনেক দেরী হয়েছে, অফিসে যাও। আর টাকাটা নাও-শিউলি বুকের ভাজ থেকেদশ টাকারদশটি নোট বের করে আলমের হাতে দেয়। আলম টাকাটা গুনে তাকায় শিউলির দিকে, দমৃদু হেসে দুকে পকেটে রেখে একহাতে টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে দাড়ায়। আবার তাকায় শিউলির দিকে, দু'জনার মুখে বিম্ভিত মৃদু হাসি। আলম প্রতিদিনের মতো বের হয়ে চলে যায়, শিউলি দরজায় দাড়িয়ে তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখদুটো হঠাত ঝাপসা হয়ে আসে। মানুষটির জন্য এক অনাবিল আনন্দে শিউলির বুক বর্ষার তুমুল প্লাবনের মতো ভরে ওঠে। আনন্দ বেদনার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে রান্না ঘরে যায়, অনেক কাজ পরে আছে তার। থালাবাটি মাজতে মাজতে শিউলি গুনগুনিয়ে সুর তোলে-ভ্রমর কইয়ো গিয়া......। শিউলির থালাবাটি মাজা অর্ধেক হয়েছে, দরজায় কষাঘাত। কষাঘাতের শব্দে কাজ ফেলে আসতে আসতে ভাবে এই অসময়ে কে হতে পারে? পাশের বাসার কেউ হবে হয়তো, দরজা খুলে দেখে আলম দাড়িয়, মুখ বিষন্ন, চোখে জল টলোমলো।
কি হয়েছে? শিউলি হাত ধরে ভেতরে টানে আলমকে। আলম চৌকির উপর ধপাস শব্দেবসে। পাশে বসে দুহাতে জড়িয়ে ধরে শিউলি-তুমি এমন করছো কেনো? অফিসে না গিয়ে ফিরে এলে যে!
শিউলি?
বলো।
এই নাও-আলমের হাতে দশ টাকার দশটি নোট।
টাকাটা দিলে না তাকে?
শিউলিকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে ওঠে আলম-মানুষটা গত রাতেমারা গেছে। এখন তার জানাজা হচ্ছে সিরিজ গাছ তলায়।

---সমাপ্ত

ভেজাল (আতিক হেলাল / ছড়া)


সবকিছুতেই ভেজাল এখন
ভেজাল সকল জিনিসে
আমি ভেজাল, তুমি ভেজাল,
ভেজাল আপনি, তিনি, সে।

চাল-আটা-নুন, তেলে ভেজাল,
ভেজাল সকল পানীয়,
কর্মে ভেজাল, মর্মে ভেজাল,
ভেজাল মুখের বানীও।

প্রেম-পিরিতি, ডেটিং ভেজাল
ভেজাল নগদ বাকিতে
নোটে ভেজাল, ভোটে ভেজাল,
ভেজাল দৃষ্টি আখিতে।

রাজনীতি বিদ; আমলা ভেজাল
ভেজাল জাদুর মন্তরে
সুখে ভেজাল, দু:খে ভেজাল
ভেজাল মনে, অন্তরে।