স্বকালে বাংলা ভাষার একজন প্রধান কবি হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। কেউ কেউ যেমন তাঁকে রবীন্দ্রানুসারী কবিদের মধ্যে বিবেচনা করেছেন, তেমনি কল্লোলের বা তিরিশের কবি হিসেবেও বর্ণিত হন কোনও কোনও আলোচনায়। কবির বেশ কিছু ইংরেজি কবিতার বঙ্গানুবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে ইংরেজ রোমন্টিক-ভিক্টোরিয়ান কবি থেকে শুরু করে আছেন বিশ শতকের টি.এস.এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫)। তবে তাঁর যে অনুবাদ এখনও মুখে মুখে ফেরে সেটি শিশুতোষ-কবিতা। আমরা চার্লস কিংসলির (১৮১৯-১৮৭৫) Sands of the Dee অবলম্বনে রচিত ‘মেঘনায় ঢল’ কবিতাটির কথা বলছি। এর বাইরে আমরা তাঁর আর একটি শিশুতোষ-অনুবাদমূলক কবিতার সন্ধান পেয়েছি। এর রচয়িতা এলিজাবেথ্ বেরেট ব্রাউনিং (৬ মার্চ ১৮০৬-২৯ জুন ১৮৬১)।
এলিজাবেথ্ বেরেট ব্রাউনিং ভিক্টোরিয়ান যুগের অপর বিখ্যাত কবি রবার্ট ব্রাউনিংয়ের (১৮১২-১৮৮৯) প্রেমিকা-স্ত্রী। বিবাহের পূর্বে তাঁর নাম ছিল এলিজাবেথ্ মলটন বেরেট। ইংল্যান্ডের ডারহামে জন্মগ্রহণকারী এলিজাবেথ্ আট বছর বয়সে গ্রীক ভাষা শিখে নেন এবং বার বছর বয়সে একটি মহাকাব্যিক কবিতা লেখেন। পনেরো বছর বয়সে তিনি স্পাইনাল কর্ডে আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং পরবর্তী জীবন একরকম চিররুগ্ন ছিলেন।একারণে প্রেমিক ব্রাউনিংয়ের বিবাহ প্রস্তাবে এলিজাবেথ তিনি যেমন প্রথমে মত দেন নি, তেমনি তার পিতাও সম্মত ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত প্রেমের জয় হয়। তাঁরা গোপনে বিয়ে করে ফ্রান্সে পালিয়ে যান। পরে সেখান থেকে ইটালিতে গিয়ে সুখের নীড় গড়ে তোলেন। এলিজাবেথ্ ইটালির ফ্লোরেন্সেই মৃত্যুবরণ করেন। বলা হয়ে থাকে, ব্রাউনিং তাঁর শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতা লিখেছেন ১৮৪৫ সালে-এলিজাবেথের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কালে এবং ১৯৬১ সালে- এলিজাবেথের মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে। তবে ব্রাউনিংয়ের কবিতায় যে ঈশ্বরে বিশ্বাস ও আস্থা লক্ষ্য করা যায়, তাতে এলিজাবেথের প্রভাব যে ক্রিয়াশীল ছিল অন্তত নিম্নোক্ত কবিতা থেকে তার ইঙ্গিত মেলে। এলিজাবেথ অবশ্য সনেট রচয়িতা হিসাবেই বেশি খ্যতিমান। তাঁর বিখ্যাত ককাব্যগ্রন্থ Sonnets From the Portuguese. শিশুদের প্রতি বিশেষ সংবেদন ছিলেন এলিজাবেথ। এর সাক্ষ্য The Cry of the Children- যেখানে শিল্পকারখানায় নির্যাতিত শিশুদের পক্ষে প্রতিবাদের সুর ধ্বনিত হয়েছে। নিচের কবিতায় শিশুদের মনমানসিকতার সাথে কবির ঘনিষ্ঠ পরিচয় ও তা প্রকাশের ক্ষেত্রে মুনশিয়ানার স্বাক্ষর আছে। হুমায়ুন কবিরও যথারীতি শব্দচয়ন, বাকবিন্যাসে তাঁর অন্যান্য অনুবাদের মত এখানেও দেশীয় আবহ নির্মাণ করেছেন। এটি পাওয়া গেছে ‘শিশুভারতী’ সংকলনের ১ম খন্ডে (কলকাতা, ১৩৩৯) ‘কবিতা চয়ন’-বিভগে। কবিতাটির শুরুতে ভূমিকাস্বরুপ লেখা ছিল-‘এলিজাবেথ্ বেরেট ব্রাউনিং ইংরাজ মহিলা কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থানীয়া। তাঁহার কবিতার মধ্যে গভীর ভাব ও চিন্তাশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। ছোট শিশুর মনে ঈশ্বর সম্বন্ধে কিরুপ ধারণা জন্মে এই কবিতাটিতে তাহা দেখানো হইয়াছে’।]
সবাই বরে বিশ্বপতির
আসন নাকি অকে উচুতে!
লম্বা ঢেঙ্গা তাল সুপারি
জট-ঝোলানো অশথ সারি
তারো উপর তাকিয়ে তব
সোনা রুপোর দীপ্তি যত
সবি শুনি তাঁরই নিশানা
খনির গহন অন্ধকারে
খুঁজে খুঁজে বারে বারে
অতল পাতাল পুরীর শেষে
তবু কি তাঁর মেলে ঠিকানা?
দয়াময়ের অশেষ দয়া
মোদের ভালবাসেন কত যে!
এই ধরণী, আকাশ খানি
নিত্য বলে তাঁহার বাণী,
মোদের সাথে আলো-ছায়ায়
লুকোচুরি খেলেন সহজে!
তবু জানি পরশ তাঁহার
মোদের লাগি সকল ভুবনে।
যখন যেথায় যেমন থাকি
জানি তাহার স্নিদ্ধ আঁখি
সকল ক্ষণে সকল কালে
জাগায় শুভ মোদের জীবনে।
স্বপ্নে আধেক আধেক জাগি
মা-মণি মোর নয়ন চুমিয়া
শুধায় যেন ঘুমের ঘোরে,
“অন্ধকারে এমন করে-
বলতো চুমো কে দেয় তোরে
মানিক আমার আমার “ঘুমিয়া?”