পুলক শব্দটাকে একসময় বেশ চল ছিল। রবীন্দ্রনাথের গানে, কবিতায় নানাভাবে পুলক শব্দের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। এক কাব্যবিশারদ রবীন্দ্রনাথের ‘কড়ি ও কোমল’- এর পুলক সম্পর্কিত একটি চরণ নিয়ে প্রবল ব্যঙ্গ করেছিলেন। কবিতার এই চরণ শব্দটিও এখন প্রায় অচল। মানুষের চরণেরও একই হাল। সব শব্দের একঘেয়েমি মানুষ বেশি দিন সইতে নারাজ।
যা-ই হোক, ‘কড়ি ও কোমল’ –এর পুলক নাচিছে গাছে গাছে। পুলককে গাছে গাছে নাচতে দিতে কাব্যবিশারদের ঘোরতর আপত্তি ছিল। পুলক পাখি নয়, বাঁদরও নয়। পুলকের অর্থ রোমাঞ্চ, আনন্দের অনুভব বা শিহরণ। এখন অবশ্য আনন্দ ও রোমাঞ্চ দুটো অর্থেই পুলক চলে। রোমাঞ্চ বা আনন্দকে তরুলতার শাখাপত্রে নাচতে দিতে কাব্যবিশারদ আপত্তি তুললেও আর কেউ তোলেননি। তোলার কথাও নয়। দৃশ্যটি অদৃষ্টপূর্ব নয় মোটেও। গাছ ছাড়াও পুলক অহরহ নানা কারণে নানা জায়গায় নাচে। ‘মধ্যে মধ্যে ভাগ্যবানে দেখিবারে পায়’।
পুলক শব্দের কথা এ জন্যই তোলা যে, ঈদ এলে গায়ে পুলক না লাগুক, পুল যে সর্বত্র তার নাচন শুরু করে দেয়, তা বেশ টের পাওয়া যায়। পুলক নাচতে থাকে রাস্তাঘাটে, ট্রেন-স্টিমারে, হাট-বাজারে, স্টোর-সুপারস্টোরে, ফুটপাতে, লক্ষাধিক টাকা দামের শাড়িতে, লেহেঙ্গায়।
আজ থেকে ষাট-সত্তর বছর আগে ঈদের পুলক গায়ে গায়ে বেশি নয়, গাছে গাছেই নাচতে বেশি। সাত-আট বছরের একশিশুর গায়ে জরিদার কটিপাঞ্জাবিই শহরের সিনেমা হলে হিন্দি সিনেমার কল্যাণে তখন দেখতে পাওয়া যেত, বাস্তবে নয়। তখন কী ছিল সাধারণ শিশুর? পপলিনের শার্ট, তাও আবার বৈচিত্রহীন রঙের-সাদা, নীল এবং ক্রিম। বিত্তবান বালকেরা পরত ইজিপশিয়ান কটনের শার্ট, এ কাপড়ের আরেক নাম ছিল মার্সিরাইজড কটন, যা নানা ঢঙে উচ্চারিত হতো। যাঁরা শহরে বাস করতেন অথবা যাঁরা উপন্যাস পড়তেন তারা সাটিনের জামা, সাটিনের পাজামা ইত্যাদির সঙ্গে নামে পরিচিত ছিলেন। বয়স বেশ খানিকটা বাড়লে ঈদে পাওয়া যেত পাঞ্জাবিই, সাদা আদ্দির। সুতি পাঞ্জাবির তখন একটাই রং। বয়স্করাও আদ্দির পাঞ্জাবি পরতেন। তবে বিত্তবানেরা ব্যবহার করতেন টুইলের কাপড়। বাচ্চা মেয়েদের জন্য কাপড় ছিল একটাই। ছিট কাপড়। তবে তা রংবেরঙের। কখনো কখনো সাটিন অথবা ভেলভেট।
ঈদে চাই নতুন জামা, নতুন জুতো-এ স্লোগান একালের বিজ্ঞাপনের। তখনকার শিশুরা এর খবর রাখত বলে মনে পড়ে না। তবে ঈদের দিনে জামাকাপড় ধোপদুরস্ত হওয়া চাই-এটা তারা জানত। কাপড় কাচার বিখ্যাত সাবানতখন সানলাইট,সোলার বল সাবান আসে আরও পরে। কাপড় নিজের হাতে অথবা মায়ের হাতে কাচা-যা-ই হোক না কেন, কাপড় দুরস্ত করা হতো নিজের হাতেই। তখন অদ্ভুত এক ইস্তিরি পাওয়া যেত-কাঠকয়লা পোরা বক্স ইস্তিরি বাড়িতে বাড়িতে নয়, পাড়ায় অথবা গ্রামের শৌখিন দু-একজনের বাড়িতে এটা থাকত বিকল্প ছিল পিতলের লোটা লোটার মধ্যে গনগনে কাঠকয়লা পুরে চলত জামাকাপড় দুরস্ত অর্থাৎ ইস্তিরি করার কাজ। কিছুই পাওয়া না গেলে ব্যবস্থা ছিল কাপড় ভাজ করে বালিশের নিচে রেখে এক রাত ঘুমানো।
নতুন জুতো –স্যান্ডেল ছিল অকল্পনীয় এক ব্যাপার। গ্রামে যারা ছিল স্কুলবালক, সারা দিন তাদের কাটত খালি পায়ে, তারপর সন্ধ্যা হলে পা ধুয়ে খড়ম। স্যান্ডেলের বাহার ও বাহুল্য কোনোটাই তখন তেমন ছিল না। স্যান্ডেল সমস্যা বড়দেরও ছিল। কাবলি স্যান্ডেল অথবা পায়ের সামনে দুই দিকে বড় বড় ফুটোওয়ালা রাবারের চটি ছিল সাধারণ পদবাহন। বিত্তবানদের অবশ্য কটকি এবং কোলাপুরি চটির সঙ্গে অপরিচয় ছিল না। আর পাওয়া যেত জুতোর মতো পায়ের পাতার মাঝখান পর্যন্ত ঢাকা ব্রাউন রঙের ভারী স্যান্ডেল, বাটার তৈরি। অনেক পরে, বাটার স্পঞ্জের স্যান্ডেল পাদুকাজগতে বিপ্লব এনে দেয়।
স্কুলবালকদের জন্য ছিল নটিবয় স্যু। পিঠাপিঠি তিন ভাই হলে বড় ভাইয়ের জন্য কেনা এক জোড়া নটিবয় দিয়ে-পরের বছর মেজো ভাই, তার পরের বছর ছোট ভাই পর্যন্ত চলে যেত। এক-আধটু বড় হলে আঙুলের সামনে তুলো গুজে দিলেই কাজ চলত। ঈদে নতুন জুতো পাওয়া ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। যাদের ভাগ্যে জুটত তারা আনন্দে জুতো শুকত এবং অন্যদের শোকাত। শুধু অকারণ পুলকে নতুন জুতো মাথার কাছে রেখে গুমিয়েছে-এমন বালকের কথা গল্প নয়, সত্যি।
গুক্লপক্ষে চাদের আলো আর কৃষ্ণপক্ষে জোনাকির আলো-এই আলো নিয়ে ছিল গ্রাম-মফস্বলের প্রাকৃতিক রাত। অধিকাংশ ঘরে জ্বলত কেরোসিনের কুপি, টিনের তৈরি-গায়ে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের মতো হাতল। অপেক্ষাকৃত বিত্তবানের ঘরে জ্বলত হারিকেন লণ্ঠন। হারিকেন তখন আসত বিদেশ থেকে। আমেরিকার তৈরি ডিজ হরিকেন ছিল তখন খুব বিখ্যাত। আর বিখ্যাত ছিল বাদুড় মার্কা হরিকেনের কাচ। ডিজ হরিকেন প্রথমে আসত ঝকঝকে পিতলের। পরে স্টিলের। কুপি জ্বলত লাল কেরোসিনে আর হারিকেন সাদা কেরোসিনে। রোগীর ঘরে জ্বলত রেড়ির তেলের মাটির প্রদীপ। থাকত পিলসুজের ওপরে। পরে আসে বায়েজিদ আর চাদ হারিকেন। ঘরে ঘরে সর্বত্র জ্বলে ওঠে হারিকেনের আলো।
যদিও নতুন চাদ দিয়ে শুক্লপক্ষের শুরু। কিন্তু ঈদের নতুন চাদের অবস্থা-এই দেখিলাম সোনার ছবি আর দেখি নাইরে। নতুন চাদ দেখার উত্তেজনা তখনকার শিশুদেরও ছিল-তবে বাড়িরছাদে দাড়িয়ে নয়, মাঠের পাশে দলবেধে দাড়িয়ে। আসলে তখন কটা বাড়িতেই বা ছাদ ছিল! যা-ই হোক, তারপরই নামত অন্ধকার। অবস্থাপন্ন বাড়ির উটোনে জ্বলত পেট্রোমাক্স লাইট, অর্থাৎ হ্যাজাক কিংবা হ্যাচাক বাতি। সে উঠোনে কেবল গল্পই চলত, কে কোন জিনিস কোন দামে কিনেছে তার বিবরণী নয়। তারাবির নামাজ নেই। অতএব গল্প শোনা আর মাঝেমধ্যে উঠে গিয়ে নতুন জামা-জুতো শুকে আসা অথবা জুতোটা আর কেউ পরে দেখার চেষ্টা করেছে কি না তা পরখ করা। ঈদ ঘিরে দু-তিন দিন ছিল বালক-বালিকাদের জন্য সত্যিই পুলকমিশ্রিত লেখাপড়ার বালই নেই এমনকি চিন্তাটাও উব যেত মাথা থেকে। কোথায় খাতা কোথায় কলম-কোনো কিছুরই বালাই নেই। তবে আতঙ্ক হতো ঈদের পরদিনই। রোজার ছুটির দিনগুলোর হিসাবে ইংরেজি আর বাংলা হাতের লেখা এবং আনুপাতিক হিসাবে অঙ্ক কষার হিসাব রাখতে ঘাম ছুটে যেত তখন ছিল দোয়াত-কলম আর ব্লটিং পেপারের যুগ। লেখায় তত গতি ছিল না।
নরুন কী? একালে ছেলেমেয়েকে নরুন বোঝাতে হবে নরুণের ছবি এঁকে তবে এ ছবি আঁকতে ডাকতে হবে প্রবীণকে। কারণ গার্হস্থ্য-উপকরণের তালিকা থেকে নরুন অন্তর্হিত হয়েছে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে। ঈদের আগে আগেই একবার করে হাজির হতো গ্রামের নাপিত। তার কাজ ছিল চুলের হাঁটুছাঁট-অর্থাৎ বালকের মাথা তার দু হাঁটুর মাঝে আটকে রেখে চুল ছোট করে কামানো আর নরুন দিয়ে নখ কেটে দেওয়া। নরুন তখন বাড়িতেও থাকত, নাপিতের কাছেও থাকত। নাপিতের নরুন নিয়ে তাই প্রবাদ তৈরি হয়েছিল-নাপিত দেখলে নখ বাড়ে। নাপিতের নরুন ফোঁড়া কাটার কাছেও ব্যবহৃত হতো। মানুষের তখন ইনফেকশনভীতি ছিল না বললেই চলে। ইনফেকশন দেখা দিলে ব্যবস্থা ছিল সিবাজল ট্যাবলেট। অনেক রোগের ঔষধ তখন গ্রামের মুদি দোকানেই বিক্রি হতো। সিবাজল ট্যাবলেট, ম্যালেরিয়ার প্যালুড্রিন ট্যাবলেট, পাঁচড়া বা চুলকানির কন্ডুদাবানল মলমের জন্য জন্য তখন বাজারে ডাক্তারখানায় ছুটতে হতো না। যিনি ঔষধ বিক্রেতা তিনিই ডাক্তার, তাই ফার্মেসি বা ঔষুধের দোকান তখন গ্রামেগঞ্জে ডাক্তারখানা নামেই বেশি পরিচিত ছিল। তবে ডাক্তারের একজন কম্পাউন্ডার থাকতেন।
ঈদের নামাজ কয়টায় শুরু হতো প্রাকৃত প্রবীণদের অনেকেরই আজ তা মনে নেই। ঈদগাহ তখন ছিল না পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় বা গ্রামে গামে। গামের বেলায় অনেক ক্ষেত্রে দেখা যেত, চার-পাঁচটি গ্রাম মিলেই একটা ঈদগাহ। ঈদের নামাজ হলেও পাঁচ গ্রামের মানুষ কিছুতেই একসঙ্গে জড়ো হতো না। মানুষ আসছে তো আসছেই। সময়ের বালাই নেই ঈদগাহে পৌঁছাতে দেখাগেল দুজন পাশের জমিতে তখনো লাঙল দিচ্ছে। ধরে নিতে হবে, ওই দুজন কাপড়চোপড় পরে না আসা পর্যন্ত ঈদের নামাজ শুরু হবে না। নামাজে দাঁড়িয়েও মোড়ল মাতব্বররা চারদিকে তাকিয়ে খোঁজ খবর নিতেন তাঁর পাড়ার লোক ঠিকমতো পৌঁছেছে কি না। তাঁদের পাড়ার পথে একজন দেখরেন, দূরে ছায়ার মতো দুজনকে দেখা যাচ্ছে। অতএব নামাজেদাঁড়িয়েও তাদের জন্য অপেক্ষা করো বিশ মিনিট। গ্রামে তো বারোটা বাজার আগে নামাজ শেষ হওয়া অসম্ভব ব্যাপার ছিল। তবে এত কেউ বিরক্ত হতো না। ওই নামাজে দাঁড়িয়েই নানা রকম হাসিঠাট্টার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দিতেন অন্যের জন্য প্রতীক্ষার বাকিটা সময়। ইমাম সাহেবেরা এখনকার মতো জমিয়ে ওয়াজ করতে পারতেন না। সময়টা তাই হাসি-মশক রাতেই কাটত। বাচ্চা নামাজিদের ফুর্তি তো ঈদগাহে সেদিন অন্তহীন। ঈদের পুলক সেদিনও তাদেরই ছিল। নামাজের পরে তো আরও আনন্দ।
ঈদের সকালটা থাকত অস্থিরতায় ভরা। ছোটদের গোসলপর্বটা অন্যান্য দিনে সারতে হতো দুপুরের আগে। কিন্তু ঈদের গোসল সকালেই হওয়া চাই। অস্থিরতা সেই গোসল নিয়েই। গ্রামে কিংবা মফস্বলে শ্যাম্পুর চল তখনো শুরু হয়নি সাবানই ছিল দেহ ও কেশের একমাত্র ভরসা। সাবানেরও তখন বাহার তেমন ছির না। খোসপাঁচড়া ঘায়েলের জন্য লাইফবয়ের বেশ খ্যাতি ছিল। সুগন্ধি সাবান বলতে লাক্স অথবা রেক্সোনা। পরে যুক্ত হয় তিব্বত এবং গ্লিসারিন সাবান পরিবারের জন্য সুগন্ধি সাবান কেনা হতো সাধারণত একটা, বড়োর দুটো। সাবানে বড়দের অধিকার ছিল সর্বাগ্রে। পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি হলে সেই সাবান নিয়ে পড়ে যেত কাড়াকাড়ি। গোসলপর্বটা কে কত দ্রুত শেষ করতে পারে, তাই নিয়ে চলত প্রতিযোগিতা।
সৌখিন পরিবারের মেয়েরা মাথার চুল ধোয়ার জন্য ব্যবহার করতেন রিঠার কষ। একমুঠো শুকনো রিঠার খোসা আগের রাতে ভিজিয়ে রাখা হতো। সকালে সেটাই হয়ে যেত শ্যাম্পু। রিঠার কষে পশমি কাপড়ও ধোয়া যেত। ভেজানো রিঠার কষে চুল হতো বেশ ঝরঝরে। গোসলের পরই শুরু হাতো ঈদের সকালের নাশতা কিংবা খাবার।
ঈদ-উল-ফিতরের আরেক নাম রোজার ঈদ। তবে বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে এই ঈদ সেমাইয়ের ঈদ নামেও বহুল পরিচিত। ঈদ মানেই সকালের খাবারে এবং সারা দিন অতিথি আপ্যায়নে সেমাই। বাংলাদেশে সেমাই কেবলই মুসলমানদের খাবার। হিন্দুদের মিষ্টান্ন দ্রব্যের তালিকায় সেমাই নেই। সেমাই নামটাই বেশি প্রচলিত, তবে সিমুই, সেঁওই ইত্যাদি নামও অনেক অঞ্চলে শুনতে পাওয়া যায়। ঈদের দিনে কারও বাড়িতে সেমাই নেই, এর চেয়ে পরিতাপের বিষয় আর হতে পারে না।
সেমাই কি কেবলই মুসলমানদের খাবার? এ ব্যাপারে খাদ্যতত্ত্বের ইতিহাস বাদ দিয়ে প্রথমে শব্দতত্ত্বের ইতিহাস অনুসন্ধান করা যেতে পারে। ভাষাবিজ্ঞানী সুনীতিকুমার চট্ট্রোপাধ্যায় ‘সেমাই’ শব্দের উৎপত্তি নির্দেশ করতে গিয়ে জানিয়েছেন, গ্রিক ‘সেমিদালিস’ শব্দ থেকে ‘সেমাই’ শব্দের উৎপত্তি।
সেমাই শব্দটা আফগানিস্তানে সেমিয়া, পাকিস্তানে সেওঁইয়া নামে চলে। ইরানি খাদ্যতালিকাতেও সেমাই দেখতে পাওয়া যায়। পোলাও, বিরিয়ানি, কোর্মা, কোপ্তা, ফিরনি ইত্যাদি মুসলমানি খাদ্য ও শব্দ যে ইরান-তুরান পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তা আর প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না।এগুলো আসার গতিপথের হদিসও সহজে নির্ণয় করা যায়। বলে দেওয়া যায় সময়টাও।
তবে সেমাইকে মেলানো কঠিন। শব্দের মতো খাদ্য হিসেবেও কি সেমাই গ্রিক খাদ্য? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হোঁচট খেতে হয়। যদি গ্রিক খাদ্যই হয়, তাহলে হিন্দুদের খাদ্যতালিকায় সেমাই অবাঞ্ছিত থাকার কথা নয়।
ইউরোপ শর্করা বা মিষ্টির দেশ নয়। গুড়, চিনি, মিছরি সৃষ্টিতে ইউরোপের কোনো অবদান নেই। ঐতিহাসিকদের মতে, গুড়ের আদিস্থল গৌড় আর ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, চিনি চীনের এবং মিছরি বা মিসরি মিসরের সৃষ্টি। এই হিসেবে সেমাই শব্দ হিসেবে গ্রিক হলেও খাদ্য হিসেবে গ্রিক নয়। কারণ গ্রিকদের খাদ্যতালিকায় মিষ্টান্ন-দ্রব্যের অবস্থান অতি নগণ্য, যদিও মসর অধিকারের ফলে শর্করার সঙ্গে তাদের পরিচয় অনেক আগেই ঘটেছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সংস্কৃত এই শর্করা শব্দ ইরান-আরব মুলুক ঘুরে ইংরেজিতে হয়েছে সুগার, জার্মানে চৎসুকার।রান্না হওয়ার আগে সেমাই হলো ময়দার তার ময়দার এই তার অনেক কাল আগে থেকেই অনেক দেশে প্রচলিত। তবে সেসব দেশে ময়দার তারর খাবার মিষ্টি নয়, লবণাক্ত। সেমাইয়ের প্যাকেটের গায়ে ভার্মিচেল্লিজ নামে ইংরেজিতে যা লেখা থাকে তার সঙ্গে বাংলাদেশে রান্না করা সেমাইয়ের কোনো মিল নেই। ভার্মিচেল্লি ইতালীয় খাবার।
মিষ্টান্ন হিসেবে নয়, ময়দার তাররূপে গ্রিক সেমিদালিস আমাদের সমোই হতে পারে। একদা ইরান-তুরান-আফগানিস্তান গ্রিকদের অধিকারে ছিল। কালে কালে সেসব দেশে হয়তো সেমিদালিস রান্নার প্রকরণ পরিবর্তিত হয়ে যায়। সেমিদালিস হয়ে ওটে মিষ্টান্ন-দ্রব্য। তারপর পোলাও-কোর্মার পথ ধরে সেমিদালিস প্রবেশ করে ভারতবর্ষে।স্বাদের পরিবর্তনের সঙ্গে নামেরও পরিবর্তন ঘটে। পোলাও-কোর্মা, ফিরনি-জরদার মতো সেমাইয়ের গায়ে লেবেল পড়ে মুসলমানি খাবার ।
ঈদে সেমাই অপরিহার্য হলেও সুদূর মফস্বল কিংবা গ্রামে ষাট-সত্তর বছর আগে ঢাকা-কলকাতার মতো রেডিমেড সেমাই সহজলভ্য ছিল না। বাড়ির মহিলাদেরই তৈরি করতে হতো ঈদের সেমাই। হাড়ি বা কলসি উপুড় করে হাতের অপূর্ব দক্ষতায় তারা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নামাতেন ময়দার তার। নানা রকম তার ধাচ ছিল। টুকরো সেমাই তৈরি হতো পিড়িতে হাত ঘুরিয়ে।পরে এল পিতলের তৈরি সেমাইকল। বেশ কয়েকটা ছাট ছিল সে কলে-কোনোটা মিহি, কোনোটা মাঝারি, কোনোটা মোটা। সেমাইকলের হাতল ঘোরানোর দায়িত্ব পড়ত ছোটদের ওপর। এটি ছিল তাদের বাড়তি ঈদ আকর্ষণ।
অর্ধশতাব্দেরও বেশি আগের সাধারণ মানুষের ঈদের কথা বলতে গিয়ে এত কথা বলা। ঈদ এমনিতেই শিশুদের আকর্ষণের বিষয় ছিল। আর তাতে ছিল অকারণ পুলক। তার জন্য অভিভাবককে বাড়তি পয়সা গুনতে হতো না। মাঝেমধ্যে প্রশ্ন জাগে, এখনকার শিশুদের সঙ্গে তখনকার শিশুদের তফাতটা কী? আদৌ কি কোনে তফাত তৈরি হয়েছে? তখনকার শিশুরা তো অল্পতেই তুষ্ট হতো। এখনকার শিশুরা হয় না? ঝা চকচকে বেশি দামের নতুন জামা-জুতো শিশুরা চয়, নাকি মা-বাবাই সাধ করে কিনে দেন? চাহিদাটা তৈরি করে দেয় কে?
আগের ঈদ মনে হতো শিশুদের। এখনকার ঈদের আনন্দটা বোধ করি বড়দের। লক্ষাধিক টাকা দামের শাড়ি, আরও বেশি দামের ভিনদেশি লেহেঙ্গা, কয়েক সহস্র টাকা মূল্যের পাঞ্জাবি-এগুলো কি শিশুদের পরিধেয়? এখনকার ঈদের পুলক দাম দিয়ে কেনা। অকারণ পুলকের কথা ভাবাই যায় না।
