দু:খময়ী শ্যামবর্ণ রাত।।
রকিবুল হাসান।।
বটমূল।। আগস্ট ২০০৮।। মূল্য ৭০ টাকা।
রকিবুল হাসান।।
বটমূল।। আগস্ট ২০০৮।। মূল্য ৭০ টাকা।
কবি রকিবুল হাসানের দু: খময়ী শ্যামবর্ণ রাত নান্দনিক প্রচ্ছদ ও ঝকঝকে ছাপা অফসেট কাগজের সুন্দর একটি কবিতার বই, বইটি যে বাহ্যিক সোন্দর্যে অনন্য হয়ে উঠেছে তাতে করে মনে হয় যে, একমাত্র কবিতার বই-ই এমন পরিছন্ন পরিচর্চার প্রমান পাওয়া সম্ভব। হয়তো এ কথাতে খানিকটা পক্ষপাত দুষ্টুতা থাকতে পারে।
পুরো কাব্যগ্রন্থ জুড়ে অনুভব হয় কষ্টজ চিৎকার, স্মৃতির শিকড়ে তার বারবার ফিরে যাবার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। শাহরীক জীবনের রুঢ় বাস্তবতায় যখন সমস্ত আবেগ বেগ-এ রুপান্তরিত হতে হতে কবি বিপর্যস্ত, তখন তিনি স্মৃতির ভেতর বিরাণ পাঁকা মাঠ আবিস্কার করে সেখানে তিনি দু-দন্ড বিশ্রাম নিয়েছেন। একটা অভিনব ও দারুণ চিত্রকল্প পাওয়া গেলো গ্রন্থের প্রথম কবিতায়-বড় চাচা হাকিম শেখ ডালির ভেতর আমাকে বসিয়ে মই দিচ্ছেন/চারা ধানের জমিতে ভয়ে ডালি ধরে কাঁপছি এখনো.../ এই যে তিনি এখনো কাঁপছেন স্মৃতি কতখানি জীবন্ত হয়ে উঠলে এমন হতে পারে তা অবশ্যই পাঠককে ভাবাতে বাধ্য। স্মৃতির বর্ণনা স্বাভাবিক, কিন্তু এই যে সেই ছোট্ট কিশোরের ভয়ে ভয়ে কেঁপে ওঠা ডালির ভেতর, কেননা মই তো চলিঞ্চু মইয়ের নিচে মাটির খন্ড কিংবা কাদার তাল সমান হয়ে যাচ্ছে। এবং ভয়, সে পড়ে যাবে না তো? কবি আজও কেঁপে চলেছেন, আমরা এই পাঠকরাও ঠিক এমনটিও হয়তো কাঁপি কখনো কখনো। আসলে বুকের ভেতর থেকে না এলে সাহিত্য বিশেষত-কবিতা, বোধহয় কখনো-তা প্রকৃত কবিতা হয়ে ওঠে না। মা প্রত্যেক কেই তো খাবারের জন্য ডাকে কিন্তু সেটাও কবিতা হয়ে ওঠে তখনি, যখন মায়ের সেই ডাকটি হুবুহু কবিতায় উঠে আসে-বাপ আর কতো জ্বালাবি?/আসি ভাত খ্যায়া নে কচ্চি,/ প্রত্যেক পাঠকেই মনে করিয়ে দেবে তার নিজস্ব স্মৃতির ব্যথাময় অংশ সমূহ, প্রত্যেকেই একবার ফিরে আসবে শৈশব-কৈসর থেকে।
কাব্য গ্রন্থের দ্বিতীয় কবিতা, আসবি তো বৈশাখে। মা অপেক্ষায় থাকে ছেলে আসবে ঢাকা থেকে, তিনি চৈত্র মাস থেকেই অপেক্ষা করে কেননা ছেলে বৈশাখে আসবে। মা চোখে পানি মুছে মনে মনে বলে-বাবা, এবার সত্যি আসবিতো বৈশাখে?
দু:খময়ী শ্যামবর্ণ রাত কবিতাটি সুন্দর একটি ভাবনাকে ঘিরে পল্লবিত হয়েছে। মানুষ এখন যেনো প্রাণহীন বধির পুতুল/শামুকের মতো লুকিয়ে নিচ্ছে নিজেকে/ শেষ লাইনে-জানি তবু একদিন সব আঁধার মুঠোয় ভরে/ জেগে উঠবেন এ কালের কোনো এক বিপ্লবী বাঘা যতিন। জীবন যাপন কবিতাটি পাঠককে বেশ ভাবিয়ে তোলে। নতুন করে বেশ কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খায় পাঠকের মনে। অসাধারণ একটি কবিতা। কতোদূর থাকো, কেন থাকো কবিতাটিতে চমৎকার স্মৃতিছবি উঠে এসেছে। কয়া, খলিসাদহ, শিলাইদহ ইত্যাদি গ্রাম গুলো, বাংলাদেশের অন্যান্য সজীব প্রাণবন্ত গ্রামের মতোই। তবু-এই কবিতাটিতে ঐসব গ্রামের একনিবিড় সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলেরপরিচয় পেয়ে গর্বিত হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্র-লালন পূন্যভূমী কুষ্টিয়া জেলার এই গ্রামগুলোর একপাস পদ্মা ও অন্য পাসে গড়াই নদী প্রবাহিত হবার ফলে বেশি বেশি সবুজে সবসময় সবুজ হয়ে থাকে এবং ঊর্বর। কবিশাহরীক সন্ধ্যার ছাদে দাঁড়িয়ে সেই প্রাণবন্ত উৎসব উচ্ছল গ্রামের খোঁজে স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান, কেননা স্পস্টতই শাহরীক জীবন ব্ড্ড যন্ত্রণাকর হয়ে ওঠে মানুষের কাছে কখনো কখনো, তখন স্মৃতি বা স্বপ্ন ছাড়া কারোরই বোধহয় গত্যান্তর থাকে না।
প্রথম কবিতা কবিতায় আমরা খুঁজে পাই এক মফস্বল শহরের তরুণ কবিকে যিনি তার প্রথম কবিতা খানি লিখেছিলেন প্রেয়সীর রক্তাভ ঠেঁটে। স্থানটি রিবিলি নদী-তীর ওপারে ধ্যানমগ্ন বটবৃক্ষ সামনের নদীতে বালুর মেদ এ সবই প্রত্যেক পাঠক নিজের নিজের আপন বিষয় ভেবে প্রীতি হবে আর এখানে কবিতার সার্থকতা।
একছাদ পৃথিবী কবিতায় আমরা দেখতে পাই ধারাবাহিক স্মৃতি কাতরতা যা অন্য কবিতাগুলোতে উপস্থিত। একটি ভালো কবিতা। অনুভবে খুব বেশী সত্য বলে মনে হয় এবং বেঁজে ওঠে এই লাইনটি- জানালায় মুখ রেখে এখনো কি খোঁজো সেই পাখি-মেঘ ফাটা রোদে ভাঙাচোরা সাইকেলে গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে জবুথুবু হয়ে ছুটে যেতো তোমার জানালা ঘেঁষা কাঁচা পথে-। বিধবা বোনের কাছে চিঠি একটি আশ্চর্য হৃদয় ভাঙা কবিতা। এখানে উঠে এসেছে পুরুষ শাসিত সমাজের বিকৃত জঘন্য প্রবৃত্তি। নিদারুণ পাশবিকতা। কবি এখানে, বোনের মাথায় নরম হাত বুলিয়ে সাহস করে দাঁড়িয়ে নতুন করে বাঁচার কথা বরেছেন।
তোমার রকম একটি সমকালীন বাস্তব কবিতা। কবিতার শরীরে সেঁটে থাকা শব্দের গাঁথুনি কী রকম পরিবর্তিত হয় তার উদাহারণ দেবার মতো লাইন যেমন-নানা বর্ণের সিমের মতোই প্রেমিক পাখিরা এখন/ইচ্ছের পুতুল যেনো-রঙধনু মেঘবতী শরীরে তোমার।
একজন সত্যিকার কবির মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত স্বকীয়তা ও মৌলিক সৃষ্টিশীলতার স্ফুরণ ঘটানো পাহাড় তলী থেকে শ্যামল আনা। কবিতায় ব্যবহৃত উপমা অলংকার খুবই সামঞ্জস্য পূর্ণ তাই এই কবিতাটি সত্যিকার ভালো একটি কবিতা হয়ে উঠেছে পাঠকের মনে। শামসুর রাহমানকে নিয়ে কবিতাটি লেখা বলে কবিকে ব্যক্তিগত অভিনন্দন। কালো বিড়াল কবিতাটি বর্তমান দেশের অস্থির পরিস্থিতির বহি:প্রকাশ। মাদকের ছোবলে তরুণ সমাজ তথা গোটা। দেশের মেরুদন্ডের প্রতি যে আঘাত আজও দৃশ্যমান তার দারুণ চিত্রায়ন এ কবিতা টি। কবি প্রশ্ন করেছেন, কারা শেষে এসব বিড়াল? পুরো কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতাই কবির ফেলে আসা সবুজি গ্রামের সেই সেই মেঠোপথ, লাউজাংলা, ধুলোমাখা পথ, গোপীনাথের মেলা, লালন মেলা শিলাইদহের মেলা বকুল তলা, প্রতিক্ষীত জানালা, গড়াই, পদ্মা, আমগাছ, রঙীন কাগজে সাজানো পথ, নৌকার ছৈ, বাজার, নদীঘাট, সে সব অনুসঙ্গ ঘুরে ফিরে এসেছে। যদিও কাব্যগ্রন্থের নাম দু:খময়ী শ্যামবর্ণ রাত তবু অধিকাংশ কবিতায় সেই ফেলে আসা স্মৃতির রক্তাক্ত আচড় বিশেষ ভাবে লক্ষনীয়।
সবশেষ কথা- কাব্যগ্রন্থর সবগুলো কবিতাই পাঠক সমাজে বাহবা পাবে বলে আমার বিশ্বাস।