আজকাল সংবাদপত্রে সমাজ তথা রাষ্ট্রীয় মঙ্গল সম্পর্কিত ও এর কাছাকাছি কয়েকটি শব্দ খুব শোনা যায়। সরাসরি প্রায়শ নয়। এই শব্দের কাছকাছি অর্থ ও ধারণা প্রকাশ করে এমন সব গুণবাচক শব্দ। এমনিতে যে-কোনও মানবিক বিষয়ের সামাজিক অনটন দেখা দিলে সেই শব্দ কাগজে কলমে খুব দেখা যায়। রাষ্ট্রে ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় চোর গায়ে গতরে বাধতে শুরু করলে 'চুরি করা মহাপাপ ইত্যাদি বাল্যশিক্ষা বর্ণপরিচয়-এর পৃষ্ঠা তেখে শুরু রিকশার পিছনে শোভা পেতে শুরু করে; শিক্ষাব্যবস্থা মেরদগুহীন হলে 'শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড'; মানুয়ের কোনওমাত্র নৈতিকতা (শব্দটি আপেক্ষিক) না ধার্মিক বা শিক্ষিত তা প্রমাণের জন্যে সাম্প্রতিক যত মানুয়ের নামের আগে ধর্মের টিকি আর শিক্ষার ঠেক দেখা যায় অতীতে তা প্রায় ছিল না। যদিও ঐপনিবেশিক শিক্ষায় বিএ প্লাক বা ম্যাট্রিক ফেল মুখে বলা হত খুব। নামের পরে বিএ-এমএ লিখতেন হীনম্মন্যতায় ভোগা উপনিবেশিত মানুষদের কেউ কেউ। এটি ইতিহাসের সাক্ষ্য।
কথায় আসা যাক। মঙ্গলময়তা- ওই মঙ্গল কার জন্যে। আলোর দিকে যাত্রা, আমঙ্গলকে না-বলা। এইসব-ই তো। অবশ্য এই সব কথা শুনতে শুনতে কান প্রায় পচে গেছে। কিন্তু আড়চোখেও তো বলা যায়, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
ওইসব শব্দকে দুর পুঁজিবাজারের প্রশ্রয়ে থেকে বেশ কল্যাণমুখী-কল্যাণমুখী লাগে। লাগলে আপত্তি নেই। যারা লাগান তাদের উদ্দেশ্যে সাধুবাদ জানাতে ইচ্ছে করে। এই প্রায় অকাজেরদেশে তারা কিছু-একটা করছেন, মন্দ কী? ব্যাকরণে ক্রিয়া পদ সর্বত্রগামী, খুব ক্ষমতাধর। কিন্তু আপত্তিটা বাঁধে অন্যখানে। এই কল্যাণময়তার কথা, মঙ্গলময় পতের দিকে যাত্রা তো আসলে প্রায় নির্বীর্য মানুষদের উদ্দেশ্যে বলা। যেন, তোমরা মঙ্গলে থাকো। মঙ্গলের দিকে যাত্রা করো। ধাও কল্যাণের দিকে, সত্যের দিকে। সুন্দরের দিকে একমাত্র মঙ্গলময় পথে থেকে না-বলাটাই তোমার পরম আর একমাত্র কাজ। একমাত্রই। কিন্তু পাশাপাশি অমঙ্গলের 'উতসে' হাত দিয়ো না। প্রতিবাদ কোরো না। প্রতিবাদ মঙ্গলময়তার বিপরীত দিকে যাত্র। তাতে কল্যাণ হয় না। ভালোত্ব থাকে না। ভালোত্ব রাখতে হবে। তুমি ভালো হও। যেন, পলিথিনের কিছু কিনো না। ওটা ভালো না। কিনে থাকলে, আগে কিনেছো আর কিনো না, কিন্তু এই কথা কখনও বলো না, বাজারে চোখের সামনে এটা এখনও পাওয়া যায় কেন? (রুপকার্থে: এখানে পলিথিনের জায়গায় মাদক থেকে যা-যা ইচ্ছে পড়ে নেওয়া যায়)। এই কল্যাণেময় মঙ্গলময় শুভবোধসম্পন্ন প্রজন্ম দেখলে হাসি পায়। সব কিছু উপরি ভাসা, ধরি মাছ না-ছুই পানিকে জীবনের ধ্রুবতারা করে এরা সমুখে শান্তি পারাবারে ব্রতী। এরা এমন মঙ্গলের দিকে যাত্র করেছে যে, ভাসানী আর মণি সিংহ, শেখ মুজিব আর খাজা নাজিমুদ্দিন প্রত্যেককেই রাজনীতিক হিসেবে চেনেন। মাপেনও এক পালায়। নিশ্চিত ভাবেন মানুষ হিসেবেও তারা কমবেশি খারাপ, আর নয় রাজনীতি করত কেন? তবু তারা যে মাঝেমধ্যে মঙ্গলালোকে গাইতে গাইতে ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে উদয়ের পথে ধাবিত: হয়- এইটুকু ভালো লাগে। কিন্তু চারিদিকে যেভাবে মঙ্গলাঙ্ক্ষার ছাড়ছড়ি তাতে কোনও কচিকণ্ঠে 'কারার ওই লৌহকপাট' ধ্বনিত হলে জীবন থেকে নেয়ার রওশন জামিলের সেই অনবদ্য উচ্চারণের সঙ্গেমিলিয়ে মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী বলবেন, কী ব্যাপার! কারাগার, তাহলে, চোর ডাকাত নিশ্চিত।
কারাগার ভালো না, ভালো মানুষের জন্যেও না। প্রশ্ন তোলা যাবে না। তাতে ভালো থাকা হবে না। সব মঙ্গল আগামী প্রজন্মকে চতুর্দিকে দিয়ে ঘিরে থাকুক। সেখানে কারাগার বা প্রতিবাদের কোনও আচা না-লাগে। মিডিয়া তো এই মঙ্গলময়তা ছড়াতে ছড়াতে পুজিকে জানিয়ে দিয়েছে, আমরা আর কোনও নেলসন ম্যান্ডেলা জন্মাতে দেবনা। চে গুয়েভারা আরও দূরের ব্যাপার: তাকে তো না-ই।
এমন 'মহান' মঙ্গলময়তার জয় হোক।
এ কথা শুনলে আজ রাজপুত্র গৌতম খুব খুশি হইতেন।
শুনে, বর্তমান রাজপুত্রেরা খুশি হলেন।
আর, রাজপুত্রদের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী মিডিয়ার মতো ক্ষমতাধর কে আছে?
কার মতন লিখলে যে হবে?
চিঠিটা নিজের লেখার কয়েক জায়গায় ব্যবহার করেছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, প্রাপক-প্রেরকের নামও বদলে গেছে তাতে; যখন যে জন্যে প্রয়োজন হয়েছে, সেখানে সেই প্রয়োজনে ব্যবহার কেছেন। আমি অন্তত তিনটি জায়গায় দেখেছি ও মনে করতে পারি। এখানে এক জায়গা তেকে টুকে দিই:
১৯১০ সালের ইংরেজির এম-এ ও ১২ সালের বি-এল, কলকাতা হাইকোর্টের প্রবীণত প্র্যাকটিসিং অ্যাডভোকেট আমার শ্বশুর-মশায় শ্রীযুক্তবাবু সুরেন্দ্রনাথ বসু (মৃত্যু ১৯৮১) তার নবাগতা শ্যালিকা তথা আমার পরলোকগতা মাসি-শাশুড়িকে দুমকা থেকে ১৯১৪ সালে একটি চিঠি লিখেছিলেন। তাতে লেখেন: 'বা: খুকী! তুমি তো সুন্দর পত্র লিখিতে শিখিয়াছ! দেখিবে, বঙ্কিমচন্দ্রের মতো লিখিবে। রবীন্দ্রনাথের মতো লিখিবে না।' তাহলে দাড়াচ্ছে, ঘোরতর রবীন্দ্র-জামানার মানুষ, রবীন্দ্রকাল ও বিভায় যারা বড় হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত তাদের কাছের রবীন্দ্রনাথের গদ্য তখনও পর্যন্ত কোনও নিদর্শন নয়। না, ঠিক বলা হল না, হয়তো নিদর্শন কিন্তু অনুকরণযোগ্যতা পায়নি; রবীন্দ্রনাথের গদ্য মোটেই অনুকরণযোগ্য নিদর্শন নয় তখন। কেন?
একটু এগিয়ে ধরে নিচ্ছি ওই চিঠি গত শতকের বিশের দশকে লেখা। লিখতে বলা হচ্ছে বঙ্কিমী গদ্যে। বঙ্কিম তখন সাহিত্যসম্রাট হিসেবে একমেবাদ্বিতীয়। তার জুড়ি নেই। অন্তত তখন পর্যন্ত গদ্যে। যদিও কবি রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেয়েছেন কয়েক বছর হয়ে গেল। নিশ্চিত বিশ্বকবি উপাধি লাভও হয়েছে তার। কিন্তু ব্যক্তিগতজীবনে গদ্য লিখবার জন্যে তার গদ্য কেন মান্যতা পায়নি। হতে পারে, ১৯১৪-র পর বাংলা সাধু গদ্যরীতিতে আর নেই রবীন্দ্রনাথ। যদিও বিশের শেষ ও তিরিশের দশকে আগত কয়েকজন তরুণ ঔপন্রাসিক তাদের ঔপন্যাসিক-অভিযাত্রা শুরু করেছেন সাধুরীতির গদ্যে। এইসব মিলে, হতে পারে, সাধারণ শিক্ষিত জনগোষ্ঠির কাছে সাধুরীতির বাইরে গদ্য গদ্যই না। এই সেদিন, কি এখন, ছাত্ররা সাধু ও চলতি মিশিয়ে ক্লাসে লেখে, সাধুরীতি অফিস আদালতসহ প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে ব্যবহূত হয়। চলতি গদ্য ব্যক্তিগত প্রয়োজনে। কিন্তু কদিন আগেও সাধুরীতিতেই ব্যক্তিগত পত্রাদি লিখিত হত। আর এখন পর্যন্ত বঙ্কিমচন্দ্রই বাংলা সাধু গদ্যের শ্রেষ্ঠ কারিগর। রবীন্দ্রনাথকে মনে রেখেই। তার সাধুরীতির গদ্যে ততসম শব্দের কোনও খেলা নেই, নেই ভাষাকে গম্ভীর করে তোলার চেষ্টাও। গত শতকের বিষের দশকে কলেজে গেছেন, এমন লোকের কাছে আমি নিজেও শুনেছি, বঙ্গিমী গদ্যের প্রশংসা। কেউ ভালো চিঠিপত্তর কি উকিল মোক্তারি কোনও আদেশপত্র কি আর্জিনামা লিখবে, তারা বলতেন, ওমুক বঙ্কিমী বাংলা জানে। আজও পর্যন্ত কাউকে এই কথা বলতে শুনিনি, ওমুক রবীন্দ্রনাথের মতো বাংলা জানে। বা, চিঠি লেখে রাবীন্দ্রিকে বাংলায়।
২.
তাহলে, বাংলা লেখকের, লেখা শেখার ইত্যাদি সংক্রান্ত সকল প্রস্তাবনার শেষ লেখক কঙ্কিমচন্দ্র। তার পরে আর কেউ নেয়।
কিন্তু বিষয়টি একটু উলটো দিক দিয়ে ভাবলে এই রকম মনে হয়। ধরা যাক, ১৯১০-এর দিকে, বঙ্কিমচন্দ্র গত হবার বছর ১৫ বাদে, ভাবা হচ্ছে 'লিখিতে হইলে' বঙ্কিমচন্দ্রের মতন লেখা উচিত। এর ২০ বছর বাদে, সেই হিসাব-রবীন্দ্রনাথের মতন। এইভাবে, নিশ্চয়ই এর পরে, বিভূতিভূষণ বা তারাশঙ্করের মতন, তারপরে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতন-এইরকম। কিন্তু তা কী করে হয়? একই সঙ্গে গদ্যশিল্পী ও ঔপন্যাসিক দুই তরফের হিসাব-এই প্রসঙ্গে কোনওক্রমে ভাবাই হয়নি। অথবা ভাবাও যায়নি, সেটি ভাবা প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া, ততদিনে বাংলা গদ্য নির্মাণে বাংলা কবিতাও তো প্রয়োজন মতো গদ্যের গঠনকে কমবেশি ঝাকুনি দিয়েছে।
যে কথা দিয়ে শুরু করেছি সেইখানে ফিরছি আবার, তাহলে ব্যক্তিজীবনে গদ্যকে অনুকরণ করার সেই উদাহরণ, যে কালেই হোক, বঙ্কিমচন্দ্র। তাও তিনি গত হবার ৮০-৯০ বছর পর্যন্ত কথা কথাটা হওয়ায় ভেসেছে। কেউ অনুকরণ করুক আর নাই করুক।