দুর আকাশে মিটি মিটি অগোছালো তারাগুলো খুব যে একটা রুদ্ধশ্বাস অবস্থায় গুনছে তা নয়, এটা তার মনের গতানুগতিক চাপ কমানোর একটি পন্থা, সে হয়তো আকাশের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যেতে ভালোবাসে। নারায়নগঞ্জ থেকে আজ সকালে বের হয়েছে আরিফ। আপন বলতে শুধু ঐ চাচা ও চাচি টুকুই এই পৃথিবীতে ছিল, তাদের সাথেও আবার ঝগড়া হয়েছে, তাইতো এসেছে চিরজীবনের জন্য, চাসাড়া থেকে বাসে চেপে গুলিস্থান তার পর গাবতলি এর বেশি আর কতদুর তার গন্তব্য হতে পারে সে সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকাই এখন সে কোথায় যাবে, কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। একবার ভাবেছিল গ্রামে যাবে, সেখানেও মুখ চেনা কিছু মানুষ ছাড়া কেও নেই যে এক বেলা খেতে দিয়ে বলবে কত্তোদিন পর দেখলাম তোকে'!
আরিফ পকেটে হাত দিয়ে দেখে কানা কড়ি বলতে মজিবর মার্কা একটি মাত্র কয়েন। এই একটি কয়েন কে সম্বল করে কি চাচা-চাচির ভতসোনা থেকে চির তরে দুরে চলে যাওয়া যায়? মনে জোর থাকলে সবকিছুই সম্ভব এই বিশ্বাস টুকুই তার একমাত্র অবশিষ্ট সম্বল।
দুরে তাকিয়ে দেখ একটি ট্রাক দাঁড়িয়ে, কিছু লোক পাড়া পাড়ি করছে ওঠার জন্য, বেশি কিছু না ভেবে ছুটে যেয়ে আরিফ ও উঠে পড়ে সেই ট্রাক টিতে। ট্রাকের বড়ির সাথে ঠ্যাস দিয়ে বসে থাকে। সবাই যে যার মত কথা বলছে। ভাংগা রাস্তায় ঝাকুনি খেয়ে একজন খেপে গেলেন, প্রচন্ড বিরক্তের ভাব দেখিয়ে চিতকার দিয়ে বলে উঠলেন' শালার সরকারের আর খাওয়ার কিছু নাই, শেষে রাস্তা খাওয়া শুরু করেছে'। কেউ একজন প্রতিবাস করে বললো 'দ্যাশ তো এত বছর হইয়াগেল স্বাধীন হয়ছে, কে কি দিলেন দ্যাশ টাকে? শুধুই নিলাম এবং নিচ্ছি'। এতক্ষন যে ব্যাক্তি উব হয়ে বসে বিড়ি হুকাতে ছিল সে এবার হঠাত মাথা উচিয়ে হাক ছেরে বললো 'আরে ভাই এতই যখুন খাদক তুমি রাস্তা খাওয়ার কি দরকার, দরিয়ার পানিটুকুন খাইলে তো আমরা সেহানে হাল-চাষ জুরতে পারি।' যে ব্যাক্তি প্রতিবাদ করেছিল সে এবার বুদ্ধিজীবিদের মত উক্তি করলেন ' দ্যাশের জন্যি কাজ না করলে জনগণ সরকারের গুয়ার মদ্দিদিয়া ভোট ঢুকাই দিবিনি'।
আরিফ বিশ্বয় বনে যায় এদরে বচন শুনে, নিরক্ষর আরিফ যখন চা ষ্টলে কাজ করত তখন খুব কাজ থেকে দেখেছিল, মোটা মোটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন মানুষ দেরকে দেশকে নিয়ে চিন্তা করতে। আর এদের তো ছেড়া পোষাক, বিড়ির জটলা গন্ধ, আগুনের চোখ।
আরিফ আর এসব নিয়ে ভাবতে চাইনা। ভাবতে চাই নিজেকে নিয়ে। চাচা-চাচির অবহেলা ও ভতসোনার কথা মনে আসতেই দু:খে হতাসাই চোখে পানি চলে আসে আরিফের। ট্রাক সাই সাই গতিতে ছুটে চলেছে, ওপরে খন্ড মেঘ, ইঞ্জিনের গু গু শব্দ। বুঝতে পারে না আরিফ কে আগে, ইঞ্জিন চালিত ট্রাক, না খন্ড মেঘ। আরিফ দুর আকাশে তাকিয়ে তারার মার্বেল মেঘের থলিতে রাখে-ব্যার্থ গণনার চেষ্টা।
হঠাত আকাশের তারকাপুঞ্জের মাঝে বাবা-মা ছবি ভেসে ওঠে। মা যেন হাত ছানি দিয়ে ডাকছে আই খোকা' মানিক আমার'। আরিফ মেঘের শিড়ি বেয়ে ছুটে যায় মায়ের পরম মমতার আশ্রয়ে। আরিফ আর কখনও আসবেনা মায়ের ভালোবাসা ছেরে এই নির্মম পৃথিবীতে।
সেদিন রাতরে নবীনগর বাইপেল রোডে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনাই আরিফ মারা যায়। মৃত আরিফের রক্তাক্ত শরীর তচ্ নচ্ করে খুজে দেখে সবাই, এক টাকার একটি কয়েন ছাড়া কোন পরিচয় বা ঠিকানা সংগে নেই।